যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি

পদোন্নতির তালিকায় দণ্ডপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত ও বিতর্কিতরাও

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০

গত বৃহস্পতিবার উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন প্রশাসনের ১৭৯ জন কর্মকর্তা। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মাথায় প্রশাসনে এটিই প্রথম বড় ধরনের পদোন্নতির ঘটনা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত, বিভিন্ন বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং আলোচিত দুর্নীতির অভিযোগে নাম জড়ানো একাধিক বিতর্কিত কর্মকর্তাও এই পদোন্নতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকায় থাকা কয়েক জন কর্মকর্তার নামও পদোন্নতির তালিকায় রয়েছে। প্রশাসনের উচ্চ পদে পদোন্নতিতে এমন বিতর্কিত ঘটনায় প্রশাসনিক অঙ্গনে চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন ভুল সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

পদোন্নতির তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব মো. মাইনুল হক ভুঁইয়া গত ৩০ জুন অবসরে যান। অথচ ৯ জুলাই প্রকাশিত যুগ্ম সচিব পদোন্নতির তালিকায় ৫৩ নম্বরে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পদোন্নতির তালিকার ৬৭ নম্বরে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৫ এর সাবেক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ছাদেকুর রহমান। গত ঈদুল আজহার পর রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। পরে অসদাচরণের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তিনি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান।

এছাড়াও বেশ কয়েক জন বিতর্কিত ও বিভাগীয় লঘুদণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য পাওয়া গেছে। দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তালিকার ৩ নম্বর): প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে তিন বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল করলেও তার দণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত থাকাকালে নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে মুহাম্মদ মকবুল হোসেনকে দুই বছরের জন্য দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তার এই দণ্ড বাতিল করে।

এদিকে, ২০১৮ সালে কিশোরগঞ্জে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র সূত্রধর। আলোচিত এ মামলায় তত্কালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে আত্মসাৎ করা অর্থ ভাগবাঁটোয়ারার দাবি করে দুলাল চন্দ্র সূত্রধরসহ কয়েক জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছিলেন। এমন অভিযোগের পরও যুগ্ম সচিব পদোন্নতির তালিকার ২৫ নম্বরে রয়েছে দুলাল চন্দ্র সূত্রধরের নাম। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, বিষয়টি পৃথক আইনি প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া তালিকার ৪৩ নম্বরে থাকা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলা নির্বাহী অফিসার থাকাকালে ক তপশিলভুক্ত সম্পত্তি বিধিবহির্ভূতভাবে নামজারি করলে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণের বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলা তদন্ত শেষে তার দুইটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল করলে একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার দণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তার দণ্ড বাতিল করেন। এছাড়া তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতে আলোচিত দুর্নীতির মামলায় নাম জড়ানো বেশ কয়েক জন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

এবারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে মূলত ২৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তারাও এ তালিকায় স্থান পান। প্রশাসনে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত এ বোর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর/এপিএআর), জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা, বিভাগীয় মামলা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, অবসর-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। এসএসবির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন শেষে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে এতগুলো স্তরের যাচাই-বাছাইয়ের পরও পদোন্নতির তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম উঠে আসায় পদোন্নতি প্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

যুগ্ম সচিব পদোন্নতি ঘিরে নানা বিতর্কের বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সিনিয়র পর্যায়ের বিষয়। এখানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম চলে আসার মতো ভুল হওয়ার কথা নয়। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আত্মমর্যাদাবোধ, পেশাগত অঙ্গীকার ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে। আগে কর্মকর্তারা ভুল হলে জবাবদিহি ও সম্মানহানির ভয় পেতেন। এখন সেই সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এমন ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রশাসনের প্রথম বড় পদোন্নতি। ফলে এ সিদ্ধান্তে এমন বিতর্ক সরকারের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ অবস্থায় কোন কর্মকর্তার হাতে এই ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এটি গাফিলতির কারণে হয়েছে, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে, সেটাও তদন্ত করা উচিত।

ইত্তেফাক/এমএস