বিশ্বকাপে জনপ্রিয় হলেই ম্যাচসেরা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ২৩:৪১

বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটার পর ম্যাচসেরার পুরস্কারটি যখন হাতে নিলেন স্পেনের তরুণ তুর্কী লামিনে ইয়ামাল। তার চোখেমুখে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের সামনে তার শরীরী ভাষায় মিশে ছিল একরাশ উদাসীনতা, যা কিছুদিন আগে অস্ট্রিয়া ম্যাচের পরও দেখা গিয়েছিল।

প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া ছিল বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা যুক্তরাষ্ট্রের মালিক টিলমানের। পুরস্কার হাতে ক্যামেরার দিকে তাকাতেও যেন তার এক অদ্ভুত অনীহা! যেন তারা মনে মনে জানেন, এই পুরস্কারের জন্য তাদের চেয়েও মাঠে বেশি যোগ্য কেউ একজন ছিলেন।

মাঠের সেরা পারফরমারকে বেছে নেওয়ার এই বৈশ্বিক আনুষ্ঠানিকতা কেন খোদ ফুটবলারদের কাছেই মাঝেমধ্যে এতটা ফিকে, এতটা অর্থহীন মনে হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পুরস্কারটির বিচারপদ্ধতির বিবর্তনের ইতিহাসে।

২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ফিফা প্রথম ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার চালু করেছিল, যা ২০২২ সালে লিঙ্গনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নাম বদলে করা হয় ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। শুরুর প্রথম দুটি সংস্করণে (২০০২ ও ২০০৬) মাঠের সেরা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল ফিফার ‘টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’-এর প্রথিতযশা ফুটবল বোদ্ধাদের হাতে। সেখানে আবেগ বা জনপ্রিয়তার চেয়ে ফুটবলের নিখুঁত ব্যাকরণ, ট্যাকটিকস ও পারফরম্যান্সই ছিল শেষ কথা। 

২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে ফিফা এই বিচারের ভার তুলে দিল গ্যালারি আর ড্রয়িংরুমের আমজনতার হাতে। মুঠোফোন এসএমএস আর অনলাইনের মাধ্যমে শুরু হলো ভোটযুদ্ধ। ২০১৪ বিশ্বকাপে ভোট চলল টুইটারে (এখন যা এক্স)। আর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ থেকে ভোট পুরোপুরি চলে গেছে ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে। খেলার প্রথমার্ধ থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত যেকোনো সমর্থক মাঠে নামা যেকোনো খেলোয়াড়কে ভোট দিতে পারেন। এমনকি শেষ মুহূর্তে কোনো গোল বা দুর্দান্ত সেভ হলে নিজের ভোট বদলে নেওয়ার সুযোগও থাকে।

আর এখানেই তৈরি হয়েছে এক চরম বৈপরীত্য। পরিসংখ্যান আর খাঁটি পারফরম্যান্সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই সম্মানজনক পুরস্কার এখন রূপ নিয়েছে এক নিছক ‘জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায়’, যেখানে পারফরম্যান্সের চেয়ে খেলোয়াড়ের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’রই বেশি কদর। ২০২২ বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে খোদ বেলজিয়াম তারকা কেভিন ডি ব্রুইনা পুরস্কারটি হাতে পেয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, তিনি মনে করেন না কোনো দুর্দান্ত ম্যাচ খেলেছেন, স্রেফ নামের কারণেই হয়তো এই ট্রফি পেয়েছেন।

চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও জনপ্রিয়তার এই অন্ধ আলোয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মাঠের আসল নায়কদের অবদান। যেমন শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের ম্যাচে ৪১ বছর বয়সী মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে যখন ম্যাচসেরা ঘোষণা করা হলো, তখন এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে একটি গোল করা ছাড়া পুরো ম্যাচে তিনি একপ্রকার অদৃশ্যই ছিলেন। 

একই চিত্র দেখা গেছে আর্জেন্টিনার ম্যাচেও, যেখানে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের ম্যাচে লিওনেল মেসিকে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। অথচ মেসি প্রথম গোলটি করলেও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ নিজে একটি গোল করেছিলেন এবং মেসির গোলেও অ্যাসিস্ট করেছিলেন। এমনকি কেপ ভার্দের সিডনি কাবরালের সেই অবিস্মরণীয় লড়াইও ঢাকা পড়ে গেল মেসির জনপ্রিয়তার কাছে। 

আবার ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে জুড বেলিংহাম যখন ম্যাচসেরা হন, তখন আফ্রিকান দলটির রক্ষণভাগের অসামান্য লড়াই কোনো স্বীকৃতিই পায়নি।

তা সত্ত্বেও আমজনতার ভোটে মহাতারকাদের জয়রথ কিন্তু থামেনি। চলমান বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার এই পুরস্কার জেতার রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। নিজের খেলা প্রথম ৫ ম্যাচের মধ্যে ৪টিতেই তিনি হয়েছেন ম্যাচসেরা। ৩টি করে ট্রফি নিয়ে মেসির ঠিক পেছনেই আছেন জুড বেলিংহাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আর্লিং হলান্ড। 

আর বিশ্বকাপের সামগ্রিক ইতিহাসের হিসাব কষলে তো লিওনেল মেসি সব হিসাব-নিকাশের বাইরে; ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৫ বার এই ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’-এর ট্রফি উঠেছে তারই হাতে।

ইত্তেফাক/ এমএসআর