তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই ক্ষমতায় এসেছিলেন বালেন্দ্র শাহ। বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। কিন্তু সেই জেন-জি বিদ্রোহেই এখন টালমাটাল নেপাল। বালেন্দ্র শাহের পদত্যাগ দাবি করছেন তারা। রাজধানী কাঠমাণ্ডু থেকে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষমতায় আসার এক বছর না পেরোতেই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হলো বালেন্দ্রকে।
যে কারণে বিক্ষোভ :গত এপ্রিল থেকে কাঠমাণ্ডুসহ নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে সরকার। প্রশাসনের দাবি, প্রায় ২ হাজার ৬০০ বস্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরছাড়া প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। তাদের ঠাঁই হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। এর মধ্যে গত ২ জুলাই নেপাল সরকার নির্দেশ দেয়, ৬ জুলাইয়ের মধ্যে সব আশ্রয়কেন্দ্র খালি করে দিতে হবে। কিন্তু নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে অন্তত ৬০টি পরিবার। তারা বলছেন, তাদের যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই। এ নিয়ে ছোটোখাটো বিক্ষোভ চলছিল। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শুক্রবার। কাঠমাণ্ডুর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল ১৫০ জনকে। সেখানে বন্যার পানি ঢুকে যাওয়ায় তাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যায় নিরাপত্তা বাহিনী। শনিবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে যায় জেন-জিদের একটি দল। তাদের পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ। গুরুতর আহত হয় এক আন্দোলনকারী। এর পরেই নেপাল জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া গত বৃহস্পতিবার কাঠমাণ্ডুর পাসপোর্ট অফিসের সামনে সরকারি জায়গায় বাইক রাখার জন্য ১ হাজার নেপালি রুপি জরিমানা করা হয় গণেশ নেপালি নামের এক ব্যক্তির কাছ। অ্যাপভিত্তিক বাইক পরিষেবা দেওয়া সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ঐ ব্যক্তি গাড়িতে যাত্রীদের চাপিয়ে বিভিন্ন গন্তব্য পৌঁছে দিতেন। স্থানীয় কয়েক জনের দাবি, জরিমানা হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা দিতে না পারার কথা জানালেও জোরাজুরি করে কাঠমাণ্ডু মেট্রোপলিটন পুলিশ। তর্কের মধ্যেই গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেন গণেশ। আগুন নিভিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় গণেশকে কাঠমাণ্ডুর একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু শুক্রবার ভোরে চিকিত্সকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। তার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার পরেই নেপালের পার্লামেন্টে বালেন্দ্র সরকারের সমালোচনায় সরব হয় নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি, নেপালি কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলো। বিক্ষোভের আবহে নেপাল সরকার ঘটনার তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, বিক্ষোভের কারণে ইতিমধ্যেই কয়েক জন সমাজকর্মী, ছাত্র এবং সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে বালেন্দ্র শাহের সরকার। এর পরেই রবিবার যৌথ জাতীয় বস্তিবাসী ফ্রন্টের ডাকে রাজধানীর একটি সরকারি দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ দেখান বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী। তাদের হাতের পোস্টারে লেখা ছিল- ‘গরিবের ওপর অত্যাচার বন্ধ কর’, ‘মানবাধিকার রক্ষা কর’, ‘বেআইনি গ্রেফতারি চলবে না’, ‘ভূমিহীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই দাও’।
নেপালের জেন-জি আন্দোলনে গত বছর প্রাণ হারিয়েছিলেন ৭০ জনেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে ১৯ জন ছিলেন তরুণ। প্রাথমিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হলেও কিছু দিনের মধ্যেই তা দেশে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের রূপ নেয়। নেপালের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল তরুণ প্রজন্ম। বিক্ষোভের মুখে ওলি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর নেপালে ভোট হয় গত ৫ মার্চ। ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বালেন্দ্রের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। নেপালের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন জেন-জিদের পছন্দের এই তরুণ নেতা (৩৫)। —এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টাইমস

