ফুটবল উন্মাদনায় জীবন বিসর্জনের পরিণতি নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৯

ফুটবলকে ঘিরে বাড়তে থাকা উন্মাদনা, মারামারি ও আত্মহত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ। সম্প্রতি এক অনলাইন প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, একটি খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাণ হারানো অত্যন্ত দুঃখজনক এবং একজন মুমিনের জন্য এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক একটা বাস্তবতা যে, আমাদের দেশে প্রতিবছরই খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাণ ঝরে। একজন ইমানদারের জীবন এতটা সস্তা হয়ে গেল কীভাবে যে কোথাকার কোন দেশের খেলোয়াড়রা হারলো নাকি জিতলো, তার জন্য আমরা নিজেরা মারামারিতে লিপ্ত হয়ে যাব, এমনকি খুন পর্যন্ত করে ফেলব! এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলেছে। এই উন্মাদনা যারা তৈরি করছেন এবং এই উন্মাদনাকে যারা মাত্রাহীনভাবে সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।

কুষ্টিয়ায় এক ব্যক্তির আত্মহত্যার প্রসঙ্গ টেনে আহমাদুল্লাহ বলেন, গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রিয় দল হেরে যাওয়ার পর প্রতিপক্ষের কটূক্তি ও বিদ্রূপ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অথচ তার স্ত্রী ও ছোট ছোট সন্তান রয়েছে। এমন ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, খেলাধুলা ও বিনোদন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তবে তা অবশ্যই শরিয়তের সীমার মধ্যে হতে হবে। সীমা অতিক্রম করলে তা অকল্যাণ ডেকে আনে। 

মহান আল্লাহ বলেন,

 ﴿وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾

অর্থ: "তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।"
(সুরা আল-আনআম, আয়াত: ১৪১)

তিনি বলেন, খেলাধুলা মানুষের জীবনের অংশ হতে পারে, বিনোদনও জীবনের অংশ হতে পারে; শরীয়তের সীমানার মধ্যে থেকে সেটা করতে শরিয়ত নিষেধ করে না। কিন্তু সীমালঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলার বেঁধে দেওয়া সীমানা ক্রস করে গেলে সেখানে আজ হোক বা কাল অকল্যাণ আসবেই। মানুষ একটা সময় হয়তো এটা বুঝবে, কিন্তু ততদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।

সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে শায়খ বলেন, একজন মুমিনের শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা প্রয়োজন। 

নিয়মিত ব্যায়াম করা, পরিমিত খাবার ও ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং শরীরের জন্য উপকারী খাদ্য গ্রহণ করা ইসলামের শিক্ষা।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

«الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ»

অর্থ: "শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয়।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

তিনি আরও বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا﴾

অর্থ: "হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো।"
(সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৮)

আহমাদুল্লাহ বলেন, একজন মুসলমানের উচিত এমন জীবনধারা অনুসরণ করা, যা তার দুনিয়া ও আখিরাত-উভয়ের জন্য কল্যাণকর। খেলাধুলা শরীরচর্চা ও সুস্থতার জন্য হতে পারে, কিন্তু এমন উন্মাদনা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়, যার কারণে মানুষের জীবন চলে যায়।

শেষে তিনি বলেন, যে পরিবারগুলো স্বজন হারিয়েছে, তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাই খেলার নামে অন্ধ উন্মাদনা পরিহার করে সংযমী হওয়া এবং অহেতুক কাজে সময় নষ্ট না করাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

শায়খ বলেন, আমি আবারও বলছি, ইসলাম বিনোদনকে নিরুৎসাহিত বা নিষেধ করে না, কিন্তু প্রত্যেকটা জিনিসের একটা সুনির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। যে কাজের পেছনে দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো লাভ নেই, এমন অনর্থকতা ইসলাম সমর্থন করে না। আপনি খেলাধুলা করলে শরীরে ব্যায়াম হবে, ঘাম ঝরবে এবং সুস্থ থাকবেন—সেটি আপনি করুন। কোনো কিছু যদি আপনার আনন্দের কারণ হয় এবং তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে, তবে তা করতে পারেন, কিন্তু সীমার বাইরে গিয়ে নয়। আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।

সবশেষ তিনি বলেন, যারা খেলার নামে এই উন্মাদনার মধ্যে লিপ্ত হচ্ছেন এবং এর পেছনের অনাচারগুলো খেয়াল করছেন না, তাদের উচিত এই উন্মাদনা অনতিবিলম্বে পরিহার করা। একজন মুসলমানের ইসলাম তখন সুন্দর হবে, যখন সে অহেতুক ও অনর্থক কাজ পরিহার করবে।

ইত্তেফাক/এনটিএম