রাতেই জানা হয়ে গেছে ফাইনালের টিকিট হাতে কারা অপেক্ষা করছে আজকের ম্যাচের জন্য। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড, সেমিফাইনাল ম্যাচ আজ। ফুটবল দর্শনের জন্য দুনিয়া কাঁপছে। ফুটবল রোমাঞ্চ যাদের রক্তে নাচন ধরায়, তাদের কাছে আজকের আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে বারুদের গন্ধ পাবেন। ফুটবলের ভাষায় না হোক, তবুও বলা যায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল হবে ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ম্যাচ। আঘাতের পর আঘাত ফুটবল দুনিয়ার অনুরাগীদের বুকটা মুহুর্মুহু কাঁপিয়ে দেবে। ফাইনালের আগে আরেক ফাইনালের ম্যাচ। ইংলিশ ফুটবলের পাওয়ার হাউজ একদিকে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার নান্দনিক ফুটবলের ঝংকার।
খেলবেন মেসি, লাউতেরা মার্টিনেজ, আলভারেজরা। আর মস্তিস্কের স্মৃতি টেনে আনছে মারাদোনাকে। আজ শুধুই একটি ফুটবল সেমিফাইনাল না। ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার ফুটবলযুদ্ধের সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। যেখানে আবেগ, ভালোবাসা, বেদনা কিংবা বীরত্বগাঁথা—যেটাই বলা হোক না কেন এই ম্যাচ নানা ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ৬৬-র বিশ্বকাপে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল। ৮৬-র বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় ঘটনা, যদি না ঘটত, পৃথিবীর ফুটবল এতোটা ইতিহাস সমৃদ্ধ হতো কিনা কে জানে। মেক্সিকোর মাঠে অধিনায়ক দিয়েগো মারাদানো একাই ইংল্যান্ডকে নাকানি চুবানি দিয়ে গোল করেছিলেন। গ্যারি লিনেকারের দলকে যেভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে মারাদোনা মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে দুই গোল করে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন, তা দেখে পৃথিবীর মানুষের চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। একজন মানুষ কীভাবে এতো ফুটবলারকে কাটিয়ে গোল করতে পারেন। সে ফুটবলের ঈশ্বর কিনা। শতাব্দির সেরা গোল করেছিলেন মারাদোনা। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচ নিয়ে আজও ফুটবল বিশারদরা যুক্তিতর্ক করছেন, যেটি আজও ইংলিশদের জন্য অভিশপ্ত এক ম্যাচ। মেক্সিকোর মাঠের সেই স্মৃতির কথা এখনো আর্জেন্টিনাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যায়। কীভাবে ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের চোখের সামনে বল জালে পাঠিয়েছেন। ফুটবল দুনিয়া বিস্মিত। কেউ প্রমাণ করতে পারেননি হাতে গোল করেছেন মারাদোনা। সেই থেকেই হ্যান্ড অব গোল এবং শতাব্দির সেরা গোলের গৌরব মারাদোনার আর্জেন্টিনার।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ হচ্ছে ফুটবলের শেকড়ের লড়াই। মাঠে বল পায়ে যতটা লড়াই হয়েছে, মাঠের বাইরেও ঘটেছে অনেক। ৯৮ বিশ্বকাপে দিয়েগো সিয়েমনকে লাথি মারার কারণে রেফারি ইংল্যান্ডের ফুটবলার বেকহামকে লালকার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সেই ম্যাচে টাইব্রেকিংয়ে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। পরের বিশ্বকাপে ২০০২ সালে ডেভিড বেকহামের গোলে ইংল্যান্ড হারিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইংল্যান্ড। আজ পর্যন্ত সেই ট্রফি দ্বিতীয় বার স্পর্শ করতে পারেননি ইংলিশরা।
সোনালি ট্রফি থেকে এক ম্যাচ দূরে ইংল্যান্ড। বর্তমান আর্জেন্টিনার হাত থেকে ট্রফি কেড়ে নেওয়ার শপথ ইংল্যান্ডের নতুন প্রজন্ম জুড বেলিংহাম, রাইস, গর্ডন, হ্যারি কেইনদের।
ইতিহাস বলছে বিশ্বকাপ ফুটবলে সেমিফাইনালে কখনো আর্জেন্টিনা হারেনি। আজ যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে রেকর্ড ধরে রাখার লড়াই মেসিদের। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের ফেলে আসা স্মৃতির চেয়ে এখানে মেসির পরীক্ষাটাও কম না। ৩৯ বছর বয়সের পা দিয়েছেন ফুটবল জাদুকর মেসি। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে খেলা হয়নি তার। ইংলিশদের বিপক্ষে মেসি কেমন খেলেন, সেটাও দেখা যাবে আজ।
নরওয়েকে হারিয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়ক একটা কথা বলেছিলেন সেমিফাইনাল ম্যাচটা শুধুই একটি সেমিফাইনাল নয়, এখানে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যা ভেঙেচুরে নতুন ইতিহাস গড়ার মঞ্চ হতে পারে। বলা হচ্ছে মেসিরা নাকি ক্লান্ত। আর্জেন্টিনা জানিয়েছে, তাদের ফিটনেস নিয়ে আলাদা কাজ করেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। সব কথা বলেই বা কী লাভ। ম্যাচটা তো খেলতে হবে। সব কথা শেষ কথা, মেসি যতই ভালো খেলুক, ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগকে ঠেকাতে পরীক্ষা দিতে হবে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে।

