দেশের চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যের মধ্যে এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষা নিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে এক সংসদ সদস্যের জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সংসদে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। একই সাথে চিকিৎসকের শূন্যপদ ও বেসরকারি হাসপাতালের ফি নির্ধারণ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে ৭৩৮ জনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আগাম সমন্বিত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তিনি ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের বর্তমান প্রস্তুতি, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার মশক নিধন কার্যক্রমের জবাবদিহিতা, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ, ওষুধ ও স্যালাইনের পর্যাপ্ততা এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উত্তরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। রোগ মোকাবিলায় গত দুই মাস ধরে সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে এবং মশা ও লার্ভা মারার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
তিনি জানান, ডেঙ্গু পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিট সরকারি গুদামে মজুদ আছে এবং সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর এনএস-১ পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ও সিএম পরীক্ষা ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৫০ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ১ লক্ষ ৬৬ হাজার আরডিটি টেস্ট কিট মজুদ রয়েছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যে আরও ৫ লক্ষ কিট যুক্ত হবে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী এবং মোবাইল হাসপাতালও প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
পরবর্তীতে সংসদ সদস্য সম্পূরক প্রশ্নে মন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার অমিল রয়েছে দাবি করে বলেন, জেলা সদর হাসপাতালেই আইসিইউ নেই, সেখানে ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা কীভাবে পৌঁছাবে তা স্পষ্ট নয়। একই সাথে তিনি স্থানীয় সরকারগুলোতে জনপ্রতিনিধি না থাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ, সার্জারি ও মেডিসিন চিকিৎসকের শূন্যপদ দ্রুত পূরণের তাগিদ দেন। এছাড়া ডেঙ্গু বাড়লে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য কোনো বিশেষ নির্দেশনা থাকবে কিনা তাও জানতে চান।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, তিনি উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে আইসিইউ দেওয়ার কথা বলেননি, তবে দেশের ১২টি জেলা হাসপাতালে ইতোমধ্যে ১০ বেডের আইসিইউ চালু করা হয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনে আরও ৫টি জেলায় তা চালু হবে।
চিকিৎসকের শূন্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সীমিত জনবল সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত চিকিৎসক ও নার্স পদায়ন করা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, প্রায় দেড় মাস আগেই বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মালিকদের সাথে বৈঠক করা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ বেড খালি রাখতে হবে এবং সরকারি রেট অনুযায়ী নির্ধারিত কম খরচে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে, এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো টাকা নেওয়া যাবে না।
পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সুরক্ষায় সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন।

