আজ জুলাই শহীদ দিবস

জুলাইয়ের পোস্টারবয় শহীদ আবু সাঈদ

অধিকারবঞ্চিত জাতির ভয় জয়ের প্রতীক আবু সাঈদ :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫০

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটে পুলিশের গুলির সামনে একজন দাঁড়িয়ে থাকে বুক টান করে, দুই হাত প্রসারিত করে, তার নাম আবু সাঈদ। মুহূর্তেই তার বুক ঝাঁজরা হয়ে যায় পুলিশের গুলিতে। আবু সাঈদের এই হত্যাকাণ্ড পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নতুন করে স্লোগান তৈরি হয়, ‘বুক পেতেছি গুলি কর, বুকের মধ্যে অনেক ঝড়’। আবু সাঈদই শিক্ষার্থীদের গুলির সামনে বুক পেতে দিতে শিখিয়েছে। আজ সেই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর।

সরকার আবু সাঈদ স্মরণে দিনটিকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ ঘোষণা করেছে। দিনটিকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারি নানা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী। সকালে রায়েরবাজারস্থ জুলাই শহীদ গণকবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকাল ৬টা ১ মিনিটে এই পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া সারা দেশের সব জেলায় স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ মোনাজাত, প্রার্থনা ও আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতেও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ চত্বরে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম শহরে শহীদ ওয়াসিম আকরামের শাহাদাতবরণের স্থানে স্মৃতিফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোত্সর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। শহীদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক,    পৃষ্ঠা ১৫ কলাম ১

জুলাইয়ের পোস্টারবয়

প্রথম পৃষ্ঠার পর

জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে দল-মত-পথ-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন।’ মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে বলেছেন, আজ ১৬ জুলাই। ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস। শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, শোক আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং দেশে সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সারা দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের এই দিনে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে কলেজশিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ কমপক্ষে ৬ জন শহীদ হয়েছিলেন। রংপুরে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন শহীদ আবু সাঈদ। আবু সাঈদের বুকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। কোটা সংস্কারের দাবি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে মোড় নেয়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ ১৬ জুলাইয়ের সকল শহীদের মাগফিরাত কামনা করছি। ১৬ জুলাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। এদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, প্রাণঘাতী শক্তির নির্মম প্রয়োগ এবং ভয়ভীতির রাজনীতির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র অথচ অদম্য সাহসী বীর ছাত্র-জনতা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা জাতির বিবেককে জাগ্রত করেছিল। বিশেষ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দুই হাত প্রসারিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ আবু সাঈদের সেই অমলিন দৃশ্য কেবল একটি মুহূর্ত ছিল না; সেটি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চিত একটি জাতির ভয় জয়ের প্রতীক। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অমর চেতনা আমাদের জন্য কেবল ইতিহাসের গৌরব নয়, এটি ভবিষ্যত্ নির্মাণের প্রেরণা।

র‍্যাবের নিরাপত্তা জোরদার : জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠান কর্মসূচি পালিত হবে। এই উপলক্ষে কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন এবং রাষ্ট্র ও সরকার বিরোধী কুচক্রী মহল যাতে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে সেই লক্ষ্যে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি র‍্যাবও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।

অবশেষে মামলার রায় : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ৩ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে এই রায় ঘোষণা করা হয় এবং গতমাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন আসামি হলেন, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনেই গ্রেফতার আছেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করে। এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ এ মামলার আসামি মোট ৩০ জন। এর মধ্যে ৬ জন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার‍্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।

ইত্তেফাক/এনএন