বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। কোনো পরীক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কয়েকটি উপজেলা বা কিছু এলাকার বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব জেলার প্রায় এক লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা কতটা যুক্তিসংগত—এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলোও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলছে। ফলে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্যাকবলিত এলাকার বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক শিক্ষার্থীর বাড়িতে পানি উঠেছে, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে, বই-খাতা নষ্ট হয়েছে অথবা তারা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা স্থগিত রাখা এবং তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া সম্পূর্ণ মানবিক ও যৌক্তিক।
কিন্তু চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও পরীক্ষাকেন্দ্র কি একইভাবে বন্যাকবলিত? যেসব এলাকায় রাস্তাঘাট স্বাভাবিক, পরীক্ষাকেন্দ্র সচল এবং অধিকাংশ পরীক্ষার্থী নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছে, সেখানেও কেন পরীক্ষা বন্ধ থাকবে? কয়েকটি এলাকার সংকট মোকাবিলায় পুরো বোর্ডের সব পরীক্ষা বন্ধ রাখা সবচেয়ে সহজ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে; কিন্তু এটি সবচেয়ে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
ভর্তি পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা
এইচএসসি পরীক্ষা শুধু একটি সনদ অর্জনের পরীক্ষা নয়। এর সঙ্গে মেডিকেল, প্রকৌশল ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি সরাসরি সম্পর্কিত। অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শেষ করে পূর্ণ মনোযোগে ভর্তি প্রস্তুতি শুরু করবে। অথচ চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের তখনো এইচএসসির একের পর এক পরীক্ষা দিতে হতে পারে।
বিশেষ করে মেডিকেলে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের বহুনির্বাচনী প্রশ্নের প্রস্তুতি নিতে হয়। একই সময়ে তাদের যদি বারবার পরিবর্তিত এইচএসসি রুটিন অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যেতে হয়, তাহলে অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের তুলনায় তারা স্বাভাবিকভাবেই অসম অবস্থানে পড়বে।
তাছাড়া মেডিকেলসহ বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার মেধাতালিকায় এইচএসসির ফল গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ দীর্ঘদিন পিছিয়ে গেলে ভর্তি আবেদন এবং ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে বিশেষ সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
পুরো বোর্ডের পরীক্ষা বন্ধ রাখাই কি একমাত্র উপায়?
পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিকল্প প্রশ্নপত্র, বিশেষ পরীক্ষা ও আলাদা কেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখা সম্ভব কি না, তা দ্রুত মূল্যায়ন করা উচিত।
সব পরীক্ষার্থীকে একই দিনে পরীক্ষা দেওয়ানো সমতা নিশ্চিত করার একটি পদ্ধতি। কিন্তু একটি বোর্ডের পরীক্ষা সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ রেখে অন্য বোর্ডগুলোর পরীক্ষা চালিয়ে গেলে বাস্তবে সেই সমতা আর থাকে না। সমতা মানে সবাইকে একই নিয়মে বেঁধে রাখা নয়; বরং ভিন্ন পরিস্থিতিতে থাকা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য সুযোগ দেওয়া।
বাস্তবসম্মত সমাধান কী হতে পারে
প্রথমত, চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রের পরিস্থিতি দ্রুত মূল্যায়ন করতে হবে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড ও কেন্দ্রসচিবদের সমন্বয়ে কেন্দ্রগুলোকে ‘সচল’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ‘অচল’—এই তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক, সেখানে দ্রুত পরীক্ষা শুরু করা উচিত। বন্যাকবলিত উপজেলা বা অচল কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা পরে বিকল্প প্রশ্নপত্রে নেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, কোনো পরীক্ষার্থী নিজের এলাকার কেন্দ্র বন্ধ থাকায় অন্য নিরাপদ এলাকায় অবস্থান করলে তাকে নিকটবর্তী বিশেষ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পরীক্ষা নেওয়া হলে তাদের ফলাফল, গ্রেড বা উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য রাখা যাবে না।
পঞ্চমত, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত” পরীক্ষা স্থগিত রাখার পরিবর্তে একটি সম্ভাব্য সময়সীমা জানাতে হবে। পরিস্থিতি খারাপ থাকলে সেই সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু অনির্দিষ্ট ঘোষণা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরও বাড়ায়।
ষষ্ঠত, চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা যত দিন পিছিয়ে যাবে, মেডিকেলসহ জাতীয় ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচিতে সে অনুযায়ী সমন্বয় করতে হবে। সব বোর্ডের ফল প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক প্রস্তুতিকাল না দিয়ে জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করা উচিত নয়।
সপ্তমত, উত্তরপত্র দ্রুত মূল্যায়নের জন্য বিশেষ পরীক্ষক দল, অতিরিক্ত মূল্যায়ন কেন্দ্র এবং দ্রুত ফল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে মেডিকেল ও অন্যান্য ভর্তি কর্তৃপক্ষকে এখনই প্রকাশ্যে আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন যে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই বঞ্চিত হবে না।
নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা—দুটিই প্রয়োজন
বন্যাকবলিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করার দাবি কেউ করছে না। দাবি হলো, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেসব এলাকায় পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব, সেসব এলাকার শিক্ষার্থীদের জীবন যেন অকারণে স্থবির করে রাখা না হয়।
একটি কেন্দ্র অচল হলে সেই কেন্দ্রের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। একটি উপজেলা বন্যাকবলিত হলে সেই উপজেলার জন্য বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু কয়েকটি এলাকার সংকটের কারণে পুরো বোর্ডের প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখা ন্যায়সংগত সমাধান হতে পারে না।
চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীরা বিশেষ সুবিধা চায় না; তারা চায় ভর্তি প্রতিযোগিতায় অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের মতো সমান সুযোগ। সরকারকে তাই দ্রুত জানাতে হবে—কবে পরীক্ষা শুরু হবে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে, ফল কবে প্রকাশিত হবে এবং মেডিকেলসহ জাতীয় ভর্তি পরীক্ষায় কীভাবে সমতা নিশ্চিত করা হবে।
দুর্যোগ মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ন্যায়বিচার অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণে।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক,চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

