দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় সাম্প্রতিক সময়ের বন্যায় অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্যোগে মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়ি-ঘর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কৃষি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। এছাড়া স্থানীয় রাস্তাঘাট ও স্কুল-কলেজসহ বিভিন্নভাবে সরকারি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এখনো পানিবন্দি হয়ে আছে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পরিবার।
সরকার দুর্গত এলাকায় খাদ্য, নগদ অর্থ ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দিলেও বন্যা-পরবর্তী ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে এসব মানুষের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। এ অবস্থায় বন্যা-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কৃষি পুনরুদ্ধার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িতে দিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বন্যা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সরকার ডাটাবেজ তৈরি করে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডাটাবেজের আওতায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে তাদের প্রয়োজন অনুসারে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত রাখতে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত না করে মাঠ প্রশাসনের যোগ্য কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সাত জেলায় আকস্মিক বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সমন্বিত পরিকল্পনা কাজে লাগানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মত্স্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বন্যা-কবলিত এলাকায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে এর বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে। অনেক এলাকায় বীজতলা ও সবজি খেত নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন গবাদিপশুর খামারিরাও। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় শুধু মত্স্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বেশি। পানির স্রোতে মাছ ও চিংড়ির পোনা ভেসে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার ঘের ও খামার। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বন্যায় দেশের ৪৩ জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির আউশ ও আমনের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সবজির খেত। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ লাখের বেশি কৃষক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও যশোরসহ ১৬ জেলায়। এসব এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এছাড়া বন্যা-কবলিত এলাকায় ব্রয়লার মুরগি ও সোনালি কক মুরগির উত্পাদনকারীরাও ব্যপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় দোকানদারদের মাথায়ও হাত পড়েছে। ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন তারাও। কারণ বন্যার পানি দোকানে ঢুকে চাল-ঢালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য নষ্ট হয়েছে।
সভা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত, বীজ ও সারসহ বিশেষ কৃষি প্যাকেজ বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্তদের জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি, বাঁধ ও সড়ক দ্রুত মেরামত, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এবং ত্রাণ বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বন্যা নিয়ে অপপ্রচার ঠেকাতে প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামপ্রতিক এই ভয়াবহ বন্যাকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সুশাসনের জন্য পরীক্ষা হিসেবেও দেখতে চাইছে সরকার। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় দেশের বন্যা-কবলিত এলাকায় ত্রাণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ত্রাণ বিতরণে দলীয় হস্তক্ষেপ এড়িয়ে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সরকারের লক্ষ্য।
সভায় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বন্যা মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং পানি নেমে যাওয়ার পর দুর্গত মানুষকে পুনর্বাসন করা। একইসঙ্গে কৃষি উত্পাদন পুনরুদ্ধার এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনাও রয়েছে সরকারের লক্ষ্যে। এ জন্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং কার্যক্রম সফল করতে ত্রাণ বিতরণে কোনো অনিয়ম, অপচয় বা বিতর্কের সুযোগ রাখা যাবে না। স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। সেই ডেটাবেজের ভিত্তিতেই পুনর্বাসন, কৃষি সহায়তা ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। তিনি সরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে দলীয় ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কৃষির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানিয়ে বলেন, কৃষকদের পুনর্বাসনে ধানের বীজ ও সারসহ বিশেষ কৃষি প্যাকেজ দেওয়া হবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (বকুল) জানান, পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় বিপুল পরিমাণ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইন ও অ্যান্টি-স্নেক ভেনম সরবরাহ করা হয়েছে এবং দুর্গত এলাকার চিকিত্সক-নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সভায় নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্তের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি, বীজ ও সার প্যাকেজ বিতরণ, সড়ক-বাঁধ দ্রুত মেরামত, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু, পশুসম্পদের চিকিত্সা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পানি নেমে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন সহায়তায় দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের মধ্যে সমন্বয় আরো বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অর্থের অপচয় রোধ এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন।

