চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ষাটোর্ধ্ব আশা খাতুন। তার একমাত্র সম্বল ছিল স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া ভিটেমাটি আর একটি মাটির ঘর। কিন্তু তার সেই সম্বল ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। ভেসে গেছে ঘরে থাকা ধানের গোলা, চাল, হাঁস-মুরগি ও পুকুরের মাছ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার আর কিছুই নাই, ভিটামাটি ঘর সব ভেসে গেছে। এখন কোথায় যাব, কী খাব, কোথায় থাকব! স্বামীও মারা গেছেন। ছেলেমেয়েরা যে যার মতো দিনমজুরের কাজ করে জীবন চালায়। গভীর রাতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে সব হারিয়েছি। মাটির ঘরটি মুহূর্তেই তলিয়ে যাওয়ায় এক কাপড়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।’
এখন গ্রামের এক প্রতিবেশীর পাকা ঘরের বারান্দায় দিন কাটাচ্ছেন আশা খাতুন। তিনি নিজ বাড়িতে আর বসবাস করতে পারবেন কি না, সে ব্যাপারে সন্দিহান। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশা খাতুনের মতো সহায় সম্বল হারিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য অগণিত মানুষ পাড়ি জমান অন্যত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব দুটোই বেড়েছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততার কারণে অসংখ্য মানুষ তাদের বসতবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে নদীভাঙনপ্রবণ ও উপকূলীয় এলাকার মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবার জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হয়ে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছে। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের বস্তিগুলোতে বাস্তচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যা আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়াচ্ছে।
সরকার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা, নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাও ত্রাণ, পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনর্গঠনে সহায়তা প্রদান করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তুচ্যুতি কমাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, টেকসই বাঁধ ও নদীশাসন ব্যবস্থা উন্নয়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।
ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। সেখানে প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে লাখ লাখ মানুষ সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়। আইডিএমসি—প্রকাশিত বৈশ্বিক অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত প্রতিবেদন-২০২৫-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ লাখ। তার আগের বছর দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ লাখ। ঐ বছরও বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম।
দুর্যোগ ছাড়াও দেশে গত বছর সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ২ হাজার ৮০০ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে আইডিএমসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইডিএমসি বলেছে, গত বছরের বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট বন্যায় ১৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগে শুধু জুন মাসেই ৭ লাখ ২৩ হাজার জনকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূমির ওপরের অংশের পানি শোষণ করার মতো পর্যাপ্ত অবস্থা না থাকা এবং নালা ও খালে পানিপ্রবাহে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বন্যার তীব্রতা বাড়িয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইএমওর তথ্য বলছে— জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তচ্যুত হয়ে রাজধানী ঢাকায় বাস করছে ৭ লাখ ৯০ হাজার মানুষ। আর সারা দেশে এই সংখ্যা ৫০ লাখ। সবচেয়ে বেশি বাস্তচ্যুত মানুষের সংখ্যা চট্টগ্রামে, যা প্রায় ১২ লাখ। এদিকে ২০২৫ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)’-এর দেশব্যাপী প্রথম সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪৯ দশমিক ৬ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে। বিশ্বব্যাংক তাদের ডেটাসেটে ‘আইডিএমসি’-এর তথ্য ব্যবহার করে দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশে দুর্যোগজনিত নতুন বাস্তুচ্যুতির ঘটনা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ঘটে এবং এ প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন ইত্তেফাককে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ডিসকাশন শুরুর আগেই আমরা আমাদের দেশের অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নগরায়ণ এবং স্থায়ী দখলদারিত্বের কারণে। আমাদের দেশে এখন—যখন বৃষ্টি হওয়া দরকার, তখন বৃষ্টি হচ্ছে না। যখন বৃষ্টি কম হওয়ার কথা তখন বেশি হচ্ছে, আবার অতি বর্ষণ হচ্ছে। কখনো খরা হচ্ছে। তাছাড়া ভৌগোলিকভাবেও আমাদের দেশ নাজুক অবস্থানে আছে। এই বিষয়গুলো ভাবতে হবে। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনটি ঠিক করা হচ্ছে। জনগণকে সচেতন হতে হবে, তেমনি যারা প্রকল্প হাতে নেয় তাদেরও সচেতন হতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত দেশ হিসেবে পরিচিত তাদের কিন্তু এটা নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, এখন বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে মানুষ উদ্বাস্তু হয়। এত দিন নদীভাঙনে মানুষ সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু থাকত, এখন নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ বেশি উদ্বাস্তু হচ্ছে। দুর্যোগে আগের তুলনায় মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে যায় কিন্তু তাদের যে বসবাসের জায়গা, গবাদি পশু তাদের কৃষিজমি—এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং এগুলো যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, তখন সেই এলাকায় তারা আর থাকার প্রয়োজন বোধ করে না। সব আশা হারিয়ে ফেলে। ফলে সে মাইগ্রেট করে শহরগুলোতে চলে আসে একটি ‘স্থিতিশীল’ জীবিকার সন্ধানে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ‘এখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া তাত্ক্ষণিকভাবে ঠেকাতে পারব না। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু দুর্যোগ-পরবর্তী তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা যদি আমরা সরকারিভাবে করতে পারি বা স্থানীয়ভাবে করতে পারি, তাহলে উদ্বাস্তু হওয়ার যে প্রবণতা চলমান আছে, সেটি কিছুটা কমিয়ে আনা যাবে। এ কারণে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়লেও মানুষ নিজেই পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে, মাইগ্রেট করার প্রয়োজন পড়বে না।’

