উত্তরবঙ্গের একটি এলাকায় বাবা টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দিতে পারেনি। তাই পাওনাদারকে নিজের সন্তান দিয়েছেন যে কোনো শ্রমে ব্যবহার করার জন্য—এই শিশু নির্যাতনের শিকার হলে কল আসে শিশু সহযোগিতায় সরকারের পরিচালিত হেল্প লাইন ১০৯৮-এ। হেল্প লাইন কর্তৃপক্ষ জানান—এই ধরনের শিশুশ্রমকে তারা বন্ধকি শিশুশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের শিশুশ্রমসংক্রান্ত প্রাপ্ত কলসমূহের মধ্যে এমন বিষয়ে কল বেশি আসে বলে এটি একটি ক্যাটাগরি করা হয়েছে। তারা ‘শ্রমশোষণ’ বিষয়ে আরও একটা ক্যাটাগরির কথা জানান, যেখানে শিশুর শ্রম নেওয়া হয় কিন্তু পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।
গৃহস্থালি কাজে শিশুশ্রম, বন্ধকি শিশুশ্রম, শ্রমকালীন শারীরিক নির্যাতন, মজুরিবঞ্চনা, যৌন নির্যাতন, শ্রমশোষণ ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে কাজে নিয়োজিত করার মতো বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ ও সহায়তার কল আসে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত তাদের এ সম্পর্কিত ১০১টি কল আসে। ৯৯৯-এ মে মাস পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে শিশু নির্যাতনজনিত ৩৩ কল আসে।
কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার: সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে লঞ্চ এসে ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কুলিদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে মেরাজের হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে পেছনে ফেলে দিয়ে নিজেকে এগিয়ে নেয় একজন প্রাপ্তবয়স্ক কুলি। মেরাজের সঙ্গে কথা হলে জানায় সব সময় ছোট কুলিদের (শিশু) চড়-থাপ্পড় ধাক্কা দিয়ে পেছনে রাখতে চায় তারা। ১৪ বছরের মেরাজের দুই বছরের কাজে এই অভিজ্ঞতা বেশ কয়েক বার।
এমনই এক দৃশ্য দেখা যায় কমলাপুর রেল স্টেশনেও। সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে এগারোটায় ছাড়ার কথা, এ সময় এক দম্পতি তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে উঠবে, সে সময় একজন শিশু কুলি তাদের টলি ও একটি বড় ব্যাগ নিতে গেলে একজন বড় কুলি তাকে এক থাপ্পড় দিয়ে ঝট করে বোঝা দুটো নিয়ে নেয়। যদিও ঐ ব্যক্তি এর মৃদু প্রতিবাদ করেন, কিন্তু বড় কুলি কটাক্ষ করে বলে—‘এই ছেলে বোঝা নিয়ে গেলে আর ট্রেন ধরতে হবে না’—সময় কম বলে এই বিষয়ে আর কোনো কথা হয়নি। তবে কিছু দিন পর কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে জানা যায়, বড় কুলিরা হরহামেশা ছোট কুলিদের চড়থাপ্পড়, ধাক্কা দেয়, বড়দের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়, অনেক সময় তাদের সঙ্গে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ-এর ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ জরিপে দেখা যায় শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের ৩১ শতাংশ কাজ করতে গিয়ে আহত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৬৭ শতাংশ আহত হয় কাটাছেঁড়া ও আঘাতে। এছাড়া ভারী জিনিস বহন করতে গিয়ে ঘাড়, পিঠ ও কোমরে ব্যথা পাওয়া এবং হাড় ভেঙে যাওয়া, দগ্ধ হওয়া ও মারধরের শিকার হয় শিশুরা। দেশের ৮টি বিভাগের ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি ৭ হাজার ২০০ কর্মজীবী শিশুর ওপর এই জরিপ করা হয়।
গৃহশ্রমে নির্যাতন: গৃহশ্রমিক জাতীয় ফোরাম বাংলাদেশের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা বলেন, আট বছর বয়সে তিনি গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। নানা রকম নির্যাতনের শিকার হন। আজও দারিদ্র্যের জন আট বছরের শিশুরা গৃহশ্রমিকের কাজ করতে এসে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তিনি প্রিতী উড়ান, কল্পনা, তামান্নার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে এসেছে, আলোচিত হয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। কিন্তু প্রতিনিয়তই কাজ করতে এসে গৃহশ্রমিক শিশুরা যৌন হয়রানিসহ নানা রকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তা আমরা জানলেও বন্ধ করতে পারি না।’
গবেষণা যা বলে: বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে কর্মস্থলে সহিংসতার কারণে শ্রমে নিয়োজিত ২০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) পরিচালিত ‘সিচুয়েশন অব চাইল্ড ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক জরিপে বলা হয়েছে, রাজধানীতে গৃহশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রায় ৫০ শতাংশ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার, ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ অতিরিক্ত কাজের চাপে থাকে। ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ইটভাটা ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা শিশুরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় শ্রম দেওয়ার পাশাপাশি মারধর, অপমান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কম মজুরির, মজুরি না দেওয়ার মতো নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শিশুরা দুর্বল, ঠেকানো যাবে, নির্যাতন করলে প্রতিবাদ করতে পারবে না এমন কারণে শিশুদের নিয়োগ দেওয়ার চাহিদাও বেশি। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেই মনিটরিংয়ের তেমন সুযোগ নেই। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে শিশুরা বেশির ভাগ কাজ করে। তাই কর্মক্ষেত্রে তারা নির্যাতনের শিকার হয়, তার প্রতিকার হয় না।’
নীতি থাকলেও পারিশ্রমিক ছাড়া শ্রমে: জাতীয় শিশুশ্রম নিরসননীতি ২০১০ অনুসারে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ না করা, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুরা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করলে তা অনুমোদন দেওয়া, ৫ থেকে ১১ বছর বয়সি শিশু যদি ঝুঁকিহীন কাজ করলেও শিশুশ্রম বিবেচনা করা। আর ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, সেটি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বলা আছে। তার পরও কেরানীগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে আলো-বাতাস প্রবেশহীন কারখানাগুলোতে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ করছে ইয়াসিনরা। এলাকায় ১১ হাজারের অধিক শিশুশ্রমে নিয়োজিত হলেও ৮/১০ বছর থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। শুরুতে এসব শিশু কেবল পেটেভাতে পারিশ্রমিক ছাড়া সাগরেদ হিসেবে কাজ করে। ভুল-ভ্রান্তিতে চড়-থাপ্পড় খায়।
নজরদারি জরুরি: বাসাবাড়ির কাজে তথা গৃহকর্মে ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের নিয়োগ বন্ধে কঠোর আইন করার পাশাপাশি কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে শ্রম সংস্কার কমিশন। কমিশনের প্রধান ও বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রথমত—পুলিশ, এলাকাবাসী ও সরকারের পরিদর্শন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করে বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত শিশুকে কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ, নির্যাতন বা কোনো আইন ভঙ্গ হলে তা বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

