যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকেই তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:২০

মধুপুরে বন উজাড় এবং বনভূমি জবরদখলের অভিযোগ তদন্তে বিভাগীয় কমিটি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যে বন কর্মকর্তার চাকরিকালে দোখলা রেঞ্জে বহুমাত্রিক বন অপরাধ সংঘটিত হয় সেই কর্মকর্তাকেই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

জানা যায়, মধুপুর বনাঞ্চল নিয়ে গত ২১ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে ‘মধুপুরে কলা-আনারস গ্রাস করছে রিজার্ভ ফরেস্ট’ এবং গত ৩ মে  ‘ছাল-বাকল তুলে চলছে বনের গাছ নিধন’ শিরোনামে দুটি সচিত্র খবর প্রকাশিত হয়। খবর দুটি বন অধিদপ্তরের নজরে এলে প্রধান বন সংরক্ষক অফিস গত ১৫ জুন এক পত্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেন। পত্রে যারা ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং যারা সাক্ষী তাদের সরেজমিন জিজ্ঞাসাবাদের ওপর তাগিদ দেওয়া হয়। প্রধান বন সংরক্ষকের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন অফিস গত ৩০ জুন মধুপুর সামাজিক বনায়ন ও নার্সারি কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন তনয়কে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেন। রেঞ্জার সাব্বির হোসেন গত ৩ জুলাই বন অপরাধ তদন্তে সার্বিক সহযোগিতা চেয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আগামী ২১ জুলাই দোখলা ফরেস্ট বাংলোতে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান।

শাল বন রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন শোলাকুড়ি গ্রামের পরিবেশ কর্মী করা রাতুল মুন্সি। তিনি অভিযোগ করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন তনয় গত আগস্ট হতে এপ্রিল পর্যন্ত দোখলা রেঞ্জের ফরেস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঐ সময়ে দোখলা রেঞ্জে প্রচুর বন অপরাধ সংঘটিত হয়। দুষ্কৃতকারীরা দিন-দুপুরে আগুন লাগিয়ে প্রাকৃতিক ও সামাজিক বন পুড়িয়ে ধ্বংস করে। মূল্যবান গাছপালাও তারা পাচার করে। এরপর সেসব বনভূমি জবরদখলে নিয়ে প্রভাবশালীরা আনারস ও কলাবাগান গড়ে তোলে। এসব অপরাধ সংঘটনকালে বনকর্মীরা ছিলেন নীরব। এসবের প্রতিবাদে পরিবেশ কর্মীরা একাধিক মানববন্ধন ও সমাবেশ করলে দোখলা রেঞ্জ থেকে সাব্বির হোসেনকে তড়িঘড়ি মধুপুর সামাজিক বনায়ন ও নার্সারি কেন্দ্রে বদলি করা হয়। যার চাকরিকালীন দোখলা রেঞ্জে প্রকাশ্যে বন ধ্বংস হয়, তাকেই এখন সেসব বন অপরাধ তদন্ত করে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

মধুপুরের পরিবেশ কর্মী নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিটি রেঞ্জ ও বিটে পদায়ন ও বদলিতে উৎকোচ দিয়ে হয়। যোগদানের পর মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা উেকাচের টাকা তোলার জন্য মনোযোগী হয়ে উঠেন। ফলে বন উজাড় হয়, সামাজিক বনায়নের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম হয় আর উজাড় বনভূমি প্রভাবশালীরা দখলে নেয়। দোখলা রেঞ্জের বর্তমান ফরেস্টার সৈয়দ আমিনুর রহমান জানান, তার যোগদানের আগে এ রেঞ্জে যেসব বন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেসব নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না। এখন বন অপরাধ কমে গেছে।

ফরেস্ট রেঞ্জার সাব্বির হোসেন জানান, তিনি নিজে উত্সাহী হয়ে তদন্ত করছেন না। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশ মানতে তিনি বাধ্য। দোখলা রেঞ্জের সদর বিটে আগে যেসব বন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেসবের দেখভাল বা মোকাবিলার মূল দায়িত্ব ছিল বিট অফিসার আবুল কালাম সাহেবের। তিনি একা কেন সেসবের জবাবদিহি করবেন। বন বিভাগের স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তদন্তের দিন ডাকা হয়েছে। তিনি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে রিপোর্ট দেবেন। নিজের কর্মকালীন সংঘটিত বন অপরাধের তদন্ত তিনি নিজেই করতে পারেন প্রশ্নে কোনো উত্তর দেননি। মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক রাণা দেব জানান, দোখলা রেঞ্জে বন অপরাধের ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে। তবুও সেসব ঘটনার বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে। আশা করা যায় নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মহসিন জানান, সাধারণত পত্রিকা বা গণমাধ্যমে বন বিভাগ নিয়ে কোনো খবর প্রকাশিত হলে বিভাগীয় তদন্তের নিয়ম রয়েছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইল বন বিভাগ নিয়ে গণমাধ্যমে বেশকিছু খবর প্রকাশিত হয়। বেশির ভাগ খবর তদন্ত করছেন মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক। শুধু দোখলা রেঞ্জের কয়েকটি অভিযোগ তদন্ত করবেন ফরেস্ট রেঞ্জার সাব্বির হোসেন। তাকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমএস