দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩০

মাদারীপুরের শিবচরে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা ও দক্ষ নার্স গড়িবার লক্ষ্যে একটি নার্সিং কলেজ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়; কিন্তু বর্তমানে এই প্রকল্পের দশা দেখিয়া স্থানীয় অধিবাসীগণ যাহারপরনাই হতাশ। কেননা নির্ধারিত সময় পার হইবার দুই বৎসর পরও প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয় নাই। অথচ নথিপত্রে কোন জাদুবলে ৮৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখাইয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২৮ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা বিল পরিশোধ করা হইল তাহা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। বর্তমানে নির্মাণাধীন সেই ভবনটি লতাপাতা ও আগাছায় ঢাকিয়া গিয়াছে। ইহা এখন মাদকসেবীদের ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হইয়াছে। সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও হরিলুট কেবল মাদারীপুরেই সীমাবদ্ধ নহে। ইহা এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনের এক চিরচেনা ও দুঃখজনক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হইয়াছে।

বাংলাদেশে ইদানীং এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটিতেছে, যাহা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে একশ্রেণির আমলা, প্রকৌশলী ও অসাধু ঠিকাদারের যোগসাজশে সরকারি অর্থের নয়ছয় চলিয়া আসিতেছে বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া। এখন এই অপসংস্কৃতি হইতে আমাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। উদাহরণস্বরূপ, পিরোজপুরের নাজিরপুর ও মঠবাড়িয়া অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও ছোট ছোট সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেও অনুরূপ জালিয়াতির ভূরিভূরি দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন হইয়াছে যে নথিপত্রে কাজ সম্পূর্ণ দেখাইয়া বরাদ্দকৃত সমস্ত টাকা উত্তোলন করিয়া লওয়া হইয়াছে; কিন্তু বাস্তবে মাটিতে এক কোদাল মাটিও কাটা হয় নাই কিংবা জীর্ণ কালভার্টটি ভাঙিয়া নূতন করিয়া কিছুই গড়া হয় নাই। দেশের কোটি কোটি সাধারণ করদাতার টাকা এইভাবে একশ্রেণির লুটেরা সিন্ডিকেটের পকেটে চলিয়া যাইতেছে, অথচ ইহার দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার মিলিতেছে না।

এই সর্বগ্রাসী ব্যাধির মূল কারণ অনুসন্ধান করিলে সর্বাগ্রে ধরা পড়ে সুশাসনের অভাব, জবাবদিহিহীনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার চরম ঘাটতি। উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরে তদারকির দায়িত্বে যাহারা থাকেন, সেই সরকারি কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীগণ যখন ঠিকাদারদের সহিত দুর্নীতির গোপন মিতালিতে আবদ্ধ হন, তখন প্রকল্পের গুণমান ও সময়সীমা কাগজে কলমেই বন্দি হইয়া পড়ে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ অসমাপ্ত রাখিয়া পালাইয়া যাইবার পরও কীভাবে সিংহভাগ বিল পাইয়া যায়, তাহার কোনো সদুত্তর কাহারো নিকট থাকে না। আইনের ফাঁকফোকর ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে অপরাধীরা পার পাইয়া যায় বলিয়াই দেশে এই ধরনের দুঃসাহসের পুনরাবৃত্তি ঘটিতেছে। ইহার সহিত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপরায়ণেরও সম্পর্ক রহিয়াছে বইকি। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনিয়মকারী এই সকল ঠিকাদার হয় সরাসরি সরকারি দলের সদস্য কিংবা কোনো না কোনোভাবে স্থানীয় ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকেন।

এই জাতীয় অপকর্ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করিতে হইলে সরকারকে কঠোর ও আপসহীন হইতে হইবে। প্রথমত, শিবচরসহ দেশের সকল অসমাপ্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্পের নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় অথবা উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করিয়া প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করিতে হইবে। কেবল ঠিকাদারকে ব্ল‍্যাক লিস্টেড বা কালো তালিকাভুক্ত করিলেই রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ আদায় হইবে না, বরং আত্মসাৎকৃত টাকা ক্রোক করিয়া রাজকোষে ফেরত আনিবার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, বিল অনুমোদনের সহিত সম্পৃক্ত তদারককারী প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদেরও এই অপরাধের অংশীদার হিসাবে শাস্তির মুখোমুখি করিতে হইবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও প্রকল্পের বাস্তব চিত্র যাচাই না করিয়া কোনো অর্থ ছাড়ের সুযোগ যেন না থাকে। দেশের প্রতিটি পয়সা জনগণের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও উপার্জনের ফল। তাই ইহা কোনো সিন্ডিকেটের ভোগবিলাসের উপাদান হইতে দেওয়া যায় না। সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টোলারেন্সের নীতি বাস্তবে প্রমাণ করিতে চায়, তাহা হইলে এই লুটেরা চক্রের অবসান ঘটাইয়া জবাবদিহির এক নূতন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে হইবে।

শিবপুরের ঘটনায় ইতিমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে এবং আগের দরপত্র বাতিল করা হইয়াছে। এখন নূতন করিয়া দরপত্র আহ্বান করিয়া দ্রুত অবশিষ্ট কাজ সম্পন্নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। বিষয়টি তদন্ত করিয়া কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি ধরা পড়িলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিতে হইবে আইনানুগ ব্যবস্থা।

ইত্তেফাক/এমএস