ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের তথ্য গোপন করছে পেন্টাগন, আশঙ্কা হোয়াইট হাউসের

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ২১:২৮

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) হোয়াইট হাউসের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত মজুতসংক্রান্ত তথ্য গোপন করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা। তাদের দাবি, প্রতিরক্ষা দপ্তরে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে নেতিবাচক তথ্য প্রকাশ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন কর্মকর্তারা।

 মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। গত রোববার ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর পাল্টা কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেন, বর্তমানে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ‘খারাপ খবর’ বা বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না। আরেক কর্মকর্তা বলেন, পেন্টাগনে তৈরি হওয়া এই ‘নীরবতার সংস্কৃতি’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সিদ্ধান্ত গ্রহণকেও প্রভাবিত করছে।

গত মার্চে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট এক বিশ্লেষণে জানায়, সংঘাতের প্রথম ১৬ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ১১ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ছিল, সে সময়ের ব্যবহারের ধারা অব্যাহত থাকলে পেন্টাগনের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এদিকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। জর্ডানে দুটি এবং ইরাকে একজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ইরান যদি কোনো মার্কিন সেনাকে হত্যা করে, তবে তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য তাদের দিতে হবে। তিনি এ বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনসহ সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত এফ-৩৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বন্দর আব্বাসের আশপাশের কয়েকটি সেতুতে হামলা চালিয়েছে। এতদিন উপকূলীয় সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পেন্টাগনের ভেতরে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কাটাতে সংঘাত আরও বাড়ানোর পথ বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ বর্তমানে কার্যত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় থাড এবং প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের গবেষক রায়ান ব্রোবস্ট বলেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলে সেনাদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সাধারণত একটি শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে দুটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মজুত কমে গেলে একটি দিয়েই প্রতিরোধের চেষ্টা করতে হয়, ফলে সফল হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপারেশন এপিক ফিউরির পর টমাহক ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতায় টমাহকের মজুত আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং থাডের ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

মার্কিন সামরিক অস্ত্রের মজুতসংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় অল্প কয়েকজন কর্মকর্তাই এ বিষয়ে অবগত। ফলে হোয়াইট হাউস ও শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাচ্ছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের নেতৃত্বে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা নেতিবাচক তথ্য তুলে ধরতে ভয় পান। তার ভাষায়, পেন্টাগন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখছে, তা নিয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

আরেক কর্মকর্তা দাবি করেন, হেগসেথ তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি সীমিত কয়েকজন উপদেষ্টার মধ্যে আটকে ফেলেছেন। ফলে প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেওয়া কিংবা কংগ্রেসে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও তিনি সব তথ্য পান না।

এদিকে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিলেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার গোলাবারুদের সীমিত মজুত বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার দাবি, দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই এবং হোয়াইট হাউসও হয়তো এ বাস্তবতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়।

অন্যদিকে, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত সপ্তাহে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে চালানো তিনটি হামলার তথ্য পেন্টাগন প্রকাশ করেনি। ওই হামলাগুলোতে কয়েকজন সেনা আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে পেন্টাগন। সংস্থাটির প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, হতাহতের তথ্য গোপনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তার দাবি, তিন মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেই এসব অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছে না এ অভিযোগ তুলে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা গত মঙ্গলবার ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট সংক্রান্ত বিলের অগ্রগতি আটকে দেন।

তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদ বা অস্ত্রের কোনো সংকট নেই। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ইত্তেফাক/এবিএস