খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় হঠাৎ গরুর মাংসের রং বদলে লাল থেকে নীলচে-সবুজ হয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘিরে জনমনে ব্যাপক কৌতুহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার দুপুরে পাইকগাছা পৌরসভার মডার্ন বেকারির কর্মচারীরা একটি ভোজের আয়োজন করতে গিয়ে এই অস্বাভাবিক ঘটনার মুখোমুখি হন। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা সেই সবুজ মাংসভর্তি কড়াই নিয়ে প্রথমে মাংসের দোকান, এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় ছোটেন।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কাঁচা বা রান্না করা মাংস কেন এভাবে সবুজ রূপ নিতে পারে?
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেকারির ২৫ জন কর্মচারীর জন্য পাইকগাছা বাজারের ইসমাইল নামে এক বিক্রেতার কাছ থেকে ফ্রিজে রাখা চার কেজি গরুর মাংস কেনা হয়। অন্যসব স্বাভাবিক মসলা ও তেল দিয়ে রান্না শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই কড়াইয়ে থাকা মাংস অস্বাভাবিক নীলচে-সবুজ বর্ণ ধারণ করে। পরে ঘটনাটি তদন্ত ও পরীক্ষার দাবি নিয়ে কর্মচারীরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও লিখিত অভিযোগ না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত কোনো নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই মাংসগুলো ফেলে দেওয়া হয়। মাংস বিক্রেতা দাবি করেছেন, ফ্রিজের কপার বা তামার পাত্রের বিক্রিয়া কিংবা বেকারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কারণে এমনটা হতে পারে। অন্যদিকে কর্মচারীদের দাবি, তারা রান্নায় বাড়তি কোনো রং বা কেমিক্যাল ব্যবহার করেননি।
বিজ্ঞান ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাংস রান্নার সময় বা সংরক্ষণের সময় রং সবুজ হয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক কারণ থাকতে পারে। মাংসের এই রঙের পরিবর্তনকে মূলত কয়েকটি ধাপে ব্যাখ্যা করা যায়:
প্রথমত, মিট সাইন্স বা মাংস বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ হলো 'সালফমাইওগ্লোবিন' (Sulfmyoglobin) গঠিত হওয়া। মাংসে উচ্চমাত্রায় প্রোটিন থাকে, যার মূল উপাদান 'মাইওগ্লোবিন' নামক আয়রনযুক্ত প্রোটিন। যদি মাংস দীর্ঘক্ষণ অস্বাস্থ্যকর বা অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ফ্রিজে বা কম তাপমাত্রায় সংরক্ষিত থাকে, তবে সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাস তৈরি করে এমন ব্যাকটেরিয়া বিস্তার লাভ করতে পারে। রান্নার সময় তা তাপের সংস্পর্শে এলে মাইওগ্লোবিনের সাথে সালফাইড বিক্রিয়া করে সালফমাইওগ্লোবিন নামের এক ধরণের উপাদান তৈরি করে, যা স্পষ্ট সবুজ বা নীলচে-সবুজ বর্ণ ধারণ করে।
দ্বিতীয়ত, এটি ধাতব বিক্রিয়ার কারণেও হতে পারে। সাধারণত তামার তৈরি পাত্র বা অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার কড়াইয়ে রান্না করার সময় যদি মসলায় অতিরিক্ত অম্লতা (যেমন সিরকা, লেবু বা নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক) থাকে, তবে মাংসে থাকা সালফার ও মিনারেল কড়াইয়ের ধাতুর সাথে দ্রুত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। বিশেষ করে কপারের পাত্রের ক্ষেত্রে এ ধরনের সবুজ আভা বা রাসায়নিক প্রভাব খুব স্বাভাবিক।
তৃতীয়ত, ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বা পচনপ্রক্রিয়ার সূচনাও এর অন্যতম কারণ। মাংসের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ফ্রিজিং ব্যবস্থা সঠিকভাবে না হলে 'Pseudomonas' নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া মাংসে বংশবৃদ্ধি করে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ বা পিগমেন্ট তৈরি করে যা রান্না করার সময় বা আলোর উপস্থিতিতে সবুজ আভা তৈরি করে। যদিও স্বাভাবিক পচা মাংসে দুর্গন্ধ থাকে, তবে পচনের প্রাথমিক ধাপে দুর্গন্ধ না বের হলেও রঙের এমন পরিবর্তন ঘটতে পারে।
চতুর্থত, গরু জবাইয়ের আগে বা পশুখাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক, প্রতিষেধক বা ভারী ধাতুর উপস্থিতি কিংবা ফ্রিজে দীর্ঘদিন কেমিক্যালের সান্নিধ্যে রাখার ফলেও এমন অস্বাভাবিক রূপান্তর ঘটা অসম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাংসের রং যদি রান্নার সময় অস্বাভাবিকভাবে সবুজ বা নীল হয়ে যায় এবং তা থেকে যদি কোনো দুর্গন্ধ বের হয়, তবে সেটি ব্যাকটেরিয়াজনিত পচনের লক্ষণ। এ ধরনের মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। পাইকগাছার ঘটনায় মাংসের নমুনা যদি ল্যাব টেস্টের জন্য সংরক্ষণ করা হতো, তবে এটি কি নিছক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ, নাকি অন্য কোনো রাসায়নিকের প্রভাব—তা নিশ্চিত হওয়া যেত।
যেহেতু কর্মচারীরা মাংস ফেলে দিয়েছেন এবং থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ করেননি, তাই পাইকগাছার এই 'সবুজ মাংসের' রহস্য হয়তো আপাতত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই অমীমাংসিত থেকে যাবে। তবে এই ঘটনা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে সংরক্ষিত মাংস কেনা এবং রান্নার ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

