বাংলাদেশের বাইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিন বছর তিন মাস আগে শপথ নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে এই পদের মেয়াদ পাঁচ বছর।
বুধবার (২২ জুলাই) ঢাকা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ করতে পারেন বলে খবর প্রকাশ হয়। এসব খবর অনুযায়ী, শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরে বলা হয়েছে, পদত্যাগের কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতাকে উল্লেখ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
একইসঙ্গে, সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের জন্য ইতোমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন শুনেছেন বলে জানান। সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি নিজেই বললেন এটা একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তো গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। আর এটা যদি ঘটনা হয় সেটাতো আমরাও দেখবো।’
এ সময় সাংবাদিকরা গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করলে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘গণমাধ্যমে আসছে? হতে পারে, আপনারা রাষ্ট্রপতিকে জিজ্ঞেস করেন।’
প্রক্রিয়া কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে অথবা স্বাস্থ্যগত কারণে, যে কোনো কারণে চাইলে, তার সেটা অপশন আছে।
এক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কী এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীবলেন, ‘সরকারের কোনো পদক্ষেপ নাই এখানে।’
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকরা উল্লেখ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে তো আর কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় দেখছেন যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ইত্যাদি, আমিও শুনছি।’
উনি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করছেন কি না এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রপতিকেই প্রশ্নটি করতে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উনি চিকিৎসার্থে কিছুদিন আগে বিদেশে গিয়েছিলেন তো চিকিৎসা তো নিতেই পারেন।’
কিন্তু পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদের আগেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এসব নিয়ে মানুষের মাঝে কৌতুহলও রয়েছে। রাষ্ট্রপতি কার কাছে পদত্যাগপত্র দেবেন অথবা তার অনুপস্থিতিতে কে দায়িত্ব পালন করবেন- এমন নানা প্রশ্নও আলোচনায় আসছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। ম্যাক্সিমাম তিন মাসের মধ্যে সংসদে নির্বাচন হতে হবে।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী?
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। সর্বোচ্চ দুই বার দায়িত্ব পালন করতে পারেন তিনি।
২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সেসময় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী, প্রথম স্থানে থাকা রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সময়ের হিসাবে প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে এই পদে রয়েছেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
তাহলে মেয়াদের আগেই এখন পদত্যাগ করতে চাইলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, সেটি সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া আছে বলে জানান সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পদত্যাগ করতে হলে এখন সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে তাকে পত্র জমা দিতে হবে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ সম্পর্কে সংবিধানের ৫০ এর তিন অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করে দেওয়া পত্রটি খুব ছোট হয় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন ‘উনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। স্বেচ্ছায় হোক বা চাপে পড়ে হোক, যেটাই হোক উনি লিখবেন, আমি স্বাস্থ্যগত বা ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করলাম। পদত্যাগ ইমিডিয়েটলি কার্যকর হয়। এটা দুই লাইনের চিঠি হয় সাধারণত। সাধারণত ব্যক্তিগত কারণই উল্লেখ করেন সকলে।’
একইসঙ্গে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সাথে সেটি গ্রহণ বা গ্রহণ না করার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও উল্লেখ করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
তিনি বলেন, ‘এসব পদে পদত্যাগপত্র হ্যান্ডওভার করলেই কার্যকর হয়ে যায় সাধারণত। মানে পদত্যাগপত্রটা স্পিকারের কাছে পৌঁছে দিলেই স্পিকার পাওয়ার সময় থেকেই কার্যকর হবে, মানে এখানে গ্রহণ করার, না গ্রহণ করার কোনো স্কোপ নাই। পদত্যাগপত্র লিখলেই এটা গ্রহণীয়।’
পদত্যাগপত্র দেওয়ার পরে কী হবে?
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই পদ শূন্য থাকবে না বলে জানান শাহদীন মালিক। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে অনুপস্থিতি প্রভৃতির কালে রাষ্ট্রপতি পদে স্পিকার থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত, কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন।’
এই অনুচ্ছেদটির ব্যাখ্যা করে আইনজীবী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করা বা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্যবর্তী যে সময়, ওই সময়ে স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’
পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষের আগে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে ওই পদ শূন্য থাকবে না, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির-পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে ওই পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষের তারিখের আগে ৯০ অথবা সর্বনিম্ন ৬০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তবে এই নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি শর্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে।
এতে বলা হয়েছে, যে সংসদ রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেছে, সেই সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে যদি রাষ্ট্রপতির পদ খালি হয় তাহলে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যাবে না।
একইসঙ্গে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকের দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
এছাড়া রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণ হলে নির্বাচনের বিষয়ে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হবার পর নব্বই দিনের মধ্যে সেটি পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, পদত্যাগ করলে বা রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করবে। সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। তিন মাস বা দুই মাস যেটাই হোক সর্বোচ্চ তিন মাস।’
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছিল।
পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংকের সর্বোচ্চ একটি পদে থাকাবস্থায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। পরে ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
চব্বিশের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতির পট পরিবর্তন হয়। তখন জুলাই আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্বসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল।
সে সময় বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে তার বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
আওয়ামী লীগের সময়ের রাষ্ট্রপতি হলেও মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বিগত জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া, আটই অগাস্ট অন্তবর্র্তী সরকারের শপথ পড়ান। যদিও সেসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি করেছিল।
সেসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনায় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেট অফিস থেকে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
পরে ২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ‘তিনি অপমানিত হয়েছেন’ বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন।
সেসময় হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চলে যেতে চাই। এখান থেকে বেরিয়ে যেতেই আমি আগ্রহী।’
সব দূতাবাস, কনস্যুলেট থেকে রাতারাতি তার ছবি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ওই সাক্ষাৎকারে তিনে বলেছিলেন, ‘মানুষের কাছে এর মাধ্যমে একটি ভুল বার্তা যায় যে হয়তো রাষ্ট্রপতিকেই সরিয়ে দেওয়া হতে যাচ্ছে। এটি আমাকে গভীরভাবে অপমানিত করেছে।’
গত ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই আবার রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন প্রশ্নে রাজনীতিতে নানা আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির বিভিন্ন সিনিয়র নেতার নামও আলোচনায় ছিল চলতি বছরের মার্চে।
কিন্তু তখন বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।
কিন্তু মাত্র চার মাস পরেই এখন আবার রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

