কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
উল্লেখ্য, সাধারণত উপকূল বা জোয়ারের রেখার সবচেয়ে কাছের অংশ সুরক্ষিত রাখতে এই সীমানার ৫০ মিটারের মধ্যে স্থায়ী বা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেইসঙ্গে উপকূলের পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য ৫০০ মিটারের মধ্যে বড় ধরনের রিসোর্ট, হোটেল কিংবা শিল্প স্থাপনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গতকালকের বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, কক্সবাজারে ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। যেখানে পর্যটন উন্নয়ন হবে, সেখানে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠতে হবে। পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করেই উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা, তবে এমন কঠোর বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয় যাতে বিনিয়োগই না আসে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন হয়েছে, বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ। তাই পরিকল্পিতভাবে উল্লম্ব (ভার্টিক্যাল) উন্নয়নকে উত্সাহিত করতে হবে। অন্যথায় শিল্পাঞ্চল, জলাধার ও কৃষিজমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্বের বড় বড় পর্যটন নগরীগুলোতে বহুতল ভবনের মাধ্যমে পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়েছে। কক্সবাজারেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে, রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে এবং চট্টগ্রাম থেকে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কক্সবাজারকে একটি আধুনিক ডিজিটাল পর্যটন নগরীতে রূপান্তর করা হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে কক্সবাজার অন্যতম গ্রোথ হাব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। পর্যটন, বাণিজ্য ও সেবা খাতের বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে কক্সবাজারের ভূমিকা আরো শক্তিশালী হবে।
বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। তিনি জানান, বৈঠকে পর্যটন, পরিবেশ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, ভূমি, জনপ্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং কক্সবাজার পৌরসভার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই বছরের (২০২৬) মধ্যে একটি মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। এই মাস্টারপ্ল্যানের মূল লক্ষ্য হলো কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটন হাব এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা নির্ধারণ, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিদ্যমান বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করাই এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারে বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও পানি শোধনাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

