জাসদ থেকে জামায়াত, এক ভিডিওতে নড়বড়ে এমপি নজরুলের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:০০

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের রাজনীতিতে প্রায় পাঁচ দশক ধরে অত্যন্ত পরিচিত নাম গাজী নজরুল ইসলাম। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শীর্ষ পদে উঠে আসা—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তিনি।

জনগণের ভোটে তিনবার সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার গৌরব থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় নৈতিক স্খলনের দায়ে রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ট্র্যাজেডির মুখে পড়লেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের শুরু

গাজী নজরুল ইসলাম ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবের প্রাথমিক পড়ালেখা নিজ গ্রামেই সম্পন্ন করে ১৯৬৩ সালে গাবুরা জিএনএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাশ করেন। এরপর সাতক্ষীরা কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে এইচএসসি এবং পরবর্তীতে খুলনা বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ১৯৭৫ সালে তিনি বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পারিবারিক জীবনে ১৯৭৬ সালে মাকসুদা খাতুনের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতিতে আগমন

গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় জাসদ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে। ১৯৭১ সালে ডিগ্রি পরীক্ষা চলাকালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তৎকালীন ৯ নম্বর সেক্টরে মেকানিক্যাল মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আলোচনা চলাকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজেই নিশ্চিত করেন যে, গাজী নজরুল ইসলাম একজন তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাসদে যোগ দিয়ে প্রথমবার রাজনৈতিক মামলায় প্রায় তিন মাস কারাবরণ করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে জামায়াতে ইসলামীতে সাধারণ সমর্থক হিসেবে যোগ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে রোকন এবং শ্যামনগর থানা আমিরের দায়িত্ব পান। তৃণমূল সংগঠক হিসেবে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে ১৯৯৩ সালে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য পদে উন্নীত হন।

সংসদ সদস্য নির্বাচন ও কারাবাস

সংসদীয় রাজনীতিতে গাজী নজরুল ইসলাম বেশ সফল ছিলেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো জয়লাভ করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় সংসদের বাইরে থাকার পর গত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। নির্বাচনে ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামানকে (৮৫,৪৬৬ ভোট) হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রায় এক বছর জেল খাটার পাশাপাশি ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৮ সালে দফায় দফায় গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০১৮ সালের শেষ দিকে এক সাজানো মামলায় তাঁর স্ত্রী মাকসুদা খাতুন ও একমাত্র কন্যা শারমিন ফেরদৌসীকেও প্রায় ২৯ দিন কারাভোগ করতে হয়।

যে বিতর্কে রাজনৈতিক জীবনের অবসান

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায়, গত ২০ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের একটি আপত্তিকর ও বিতর্কিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটির একাধিক খণ্ড মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে সারা দেশে তীব্র সমালোচনার ঝড় তোলে। পরে এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, ভিডিওর নারীটি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে এই ঘটনায় স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ২২ জুলাই শ্যামনগরে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ২২ জুলাই বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে জানান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভায় নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অবৈধ বালুমহাল পরিচালনার অভিযোগ

বিতর্কিত ভিডিওর পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ এনেছেন সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক উপজেলা আহ্বায়ক সোলায়মান কবির। তাঁর দাবি, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলীয় এলাকার মেয়াদউত্তীর্ণ বালুমহালে এমপি গাজী নজরুলের ছেলে, ঘনিষ্ঠ অনুসারী ও শিবিরের নেতাকর্মীদের একছত্র সিন্ডিকেট ছিল। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার উত্থাপন করলেও রাজনৈতিক প্রভাবে তা বন্ধ করা যায়নি। তবে ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে এমপি নজরুলের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

দল ও ভবিষ্যৎ সংসদ সদস্য পদের সমীকরণ

এমপির বহিষ্কার ইস্যুতে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান জানান, জামায়াত একটি আদর্শিক ও নৈতিক সংগঠন। এ ঘটনায় সাময়িক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে দলের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে।

অন্যদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না তা নিয়ে আইনি আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে, কেবল দলীয় বহিষ্কারের ভিত্তিতে এমপি পদ খারিজ করা যায় না। সংসদ সচিবালয় থেকে লিখিত নোটিশ ও আইনি ধারা পর্যালোচনার পরেই এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ছাত্ররাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, দীর্ঘ শিক্ষকতা ও তিনবারের সংসদ সদস্য হওয়ার গৌরবময় অধ্যায় থাকলেও, জীবনসায়াহ্নে এসে এই বিতর্কিত অধ্যায় ও দলীয় বহিষ্কার গাজী নজরুল ইসলামের পাঁচ দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে এক বিষাদময় পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।

ইত্তেফাক/এএম