ফিনল্যান্ড প্রবাসী নারীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে যুবকের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৮:২৯

ফিনল্যান্ডে বসবাসরত এক প্রবাসী নারীর কাছে যৌতুক দাবি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার আত্মসাতের অভিযোগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা মো. আজিমুর রহমান ওরফে আজিম গাজীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার একটি আদালত।

একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফিনল্যান্ডেও একাধিক ফৌজদারি মামলায় আদালতের পরোয়ানা রয়েছে বলে মামলার আর্জি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৩ জুলাই দায়ের করা যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারার একটি মামলা আমলে নিয়ে ঢাকার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমান আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

মামলার আর্জি অনুযায়ী, বাদী বাংলাদেশ ও ফিনল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিক এবং দীর্ঘদিন ধরে ফিনল্যান্ডে বসবাস করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে পরিচয়ের পর মো. আজিমুর রহমান নিজেকে অবিবাহিত এবং সাবেক সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে আত্মহত্যার ভয়ভীতি, মানসিক চাপ এবং আবেগের সুযোগ নিয়ে তাকে বিয়েতে রাজি করানো হয়। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরের একটি কাজী অফিসে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

আর্জিতে বলা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে বাদীর কাছ থেকে ধার, সহায়তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে ধারাবাহিকভাবে অর্থ নেওয়া শুরু করেন আসামি। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় এবং পরবর্তীতে ফিনল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় ভিসা, বিমানভাড়া, হোটেল খরচ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স, পারিবারিক ব্যয়, জমি-সংক্রান্ত বিষয়, ব্যবসা, মায়ের চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বলে তিনি বারবার অর্থ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলায় আরও বলা হয়েছে, বাদীর পরিবারের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অর্থ নেওয়া হয়। এমনকি বাদীর মায়ের বন্ধক রাখা জমি ছাড়ানোর জন্যও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাদীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, নগদ অর্থ এবং পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে মোট প্রায় ৯০ লাখ টাকা আসামিকে দেওয়া হয়েছে। এসব লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যাংক ও আর্থিক নথি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও আর্জিতে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া বিয়ের পর ফিনল্যান্ডে যাওয়ার আগে বাদীর পরিবারের কাছ থেকে ২৭ ভরি স্বর্ণালঙ্কার গ্রহণ করেন আসামি। পরে ওই স্বর্ণ ফেরত চাইলে তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডে যাওয়ার পর আসামি বাংলাদেশের পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ, ফিনল্যান্ডে একটি বার স্থাপনের জন্য ৮ কোটি টাকা দাবি করেন। সর্বশেষ ২০ জুন বাংলাদেশে একটি খামার স্থাপনের জন্য ৪২ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করলে বাদী যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় ঢাকার আদালতে মামলা করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

বাদীর অভিযোগ, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে তিনি জরুরি সেবায় ফোন করলে ফিনল্যান্ডের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আসামিকে আটক করে। ওই ঘটনার পর পুলিশি তদন্ত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথির ভিত্তিতে ফিনল্যান্ডে একাধিক মামলা দায়ের হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ফিনল্যান্ডে মো. আজিমুর রহমানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন, প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে ইউরোপে যাওয়ার অভিযোগ, জোরপূর্বক অর্থ আদায় ও ভরণপোষণের ব্যয় বহনে বাধ্য করা, ম্যারিটিয়াল রেপ এবং শিশুর সামনে অনৈতিক আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগসহ মোট চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে বৈবাহিক ধর্ষণের অভিযোগের সমর্থনে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সনদও রয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব আইনি জটিলতার কারণে তার বিরুদ্ধে ইউরোপে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তিনি শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছেন বলে বাদীপক্ষ দাবি করেছে।

আর্জিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামি বর্তমানে বাদীকে তালাক না দিয়ে নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে, বিয়ের আগে নিজের পূর্বের একাধিক বিবাহের তথ্য গোপন করে প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদীর দাবি, এসব ঘটনার ফলে তিনি এবং তার সন্তান গুরুতর মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানে তারা ফিনল্যান্ডে চিকিৎসা ও থেরাপি নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামির পরিবারকে বিষয়টি জানানো হলেও তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি; বরং আসামিকে সমর্থন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। 

বাদী আদালতের কাছে অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রেপ্তার, যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা, তার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার ফেরত এবং অন্যান্য আইনি প্রতিকার চেয়েছেন।

মামলার অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. আজিমুর রহমান ওরফে আজিম গাজীর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইত্তেফাক/এপি