আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

দেশে হেপাটাইটিসে প্রতি বছর মারা যায় ২০ হাজার মানুষ

সর্বজনীন পরীক্ষা ও টিকাদানের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩০

দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ। এছাড়া বাংলাদেশে লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারের জন্য হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস দায়ী। এদেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসার হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের কারণেই হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক সর্বজনীন স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করে সবাইকে পরীক্ষা করা এবং টিকা ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে। সেই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতা বাড়ানোর উপর জোর দিতে হবে।

 ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও দেশের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রতিবছর দেশে ২০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে এই রোগে। আমরা যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার রোগী ও দরিদ্রদের চিকিৎসা চালিয়ে নিচ্ছি। হেপাটাইটিসের ওষুধ ও টিকা সহজলভ্য করার সুপারিশ জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক রোগী চিকিৎসার মাঝ পথে হারিয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় এর প্রধান কারণ ব্যয়বহুল চিকিৎসা। তিনি বলেন, ইপিআই শিডিউলে বার্থডোজ সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। তাদের হেপাটাইটিস বি ও সি সম্বন্ধে ধারণা নেই বললেই চলে। তৃণমূলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার আওতার বাইরে রেখে গেছে। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বি ও সি চিকিৎসা শহরকেন্দ্রিক, বিশেষায়িত চিকিৎসা কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ। অনেক সময় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হেপাটাইটিস বি ও সি’জনিত লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও রোগ দুটি পুরোপুরি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও এর টিকার আবিষ্কারক নোবেলজয়ী অধ্যাপক বারুচ এস. ব্লামবার্গের জন্মদিনকে স্মরণ করে ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আমাদের দেশেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিয়ে হয়ে আসছে। এ বছর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে— ‘হেপাটাইটিস: আসুন বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই’।

দিবসটি উপলক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন। তিনি তার বাণীতে বলেছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লিভার রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সমপ্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এককালীন সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে। রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরো আধুনিক ও কার্যকর করতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং সমন্বিত রোগী তথ্য ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন হেপাটাইটসে আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করছেন। দীর্ঘসময় হেপাটাইটসে আক্রান্তের কারণে মানুষ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। আর বাংলাদেশে ক্যানসারে মৃত্যুর তৃতীয় ধাপে রয়েছে লিভার ক্যানসার। হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত পানি, খাদ্য ও মল বাহিত যা ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছনতা ও জীবাণুমুক্ত খাদ্যদ্রব্যের ব্যাপারে সচেতন হলেই বিস্তার রোধ করা যায়। অপরদিকে হেপাটাইটিস বি ও সি আক্রান্ত মা হতে বাচ্চার কাছে, অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যশিক্ষা, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক (এনআইডি) স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করে সবাইকে পরীক্ষা করা এবং সংক্রমণমুক্ত ব্যক্তিদের টিকার আওতায় আনা গেলে ২০৩০ সালের আগেই বাংলাদেশকে হেপাটাইটিসমুক্ত করা সম্ভব।

ইত্তেফাক/এনএন