থাই শব্দ ইয়াবার আক্ষরিক অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই সিন্থেটিক মাদক বর্তমানে বাংলাদেশের লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। কঠোর আইন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং অতীতের চরম দমনপীড়নের পরও দেশে ইয়াবার আগ্রাসন থামানো যাচ্ছে না। বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চরম ঘাটতি এবং আর্থসামাজিক হতাশার সুযোগ নিয়ে তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে সরকারি পরিসংখ্যানেও। গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৫ শতাংশই বর্তমানে মাদকে আসক্ত। সিন্থেটিক ও আধা-সিন্থেটিক মাদকের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চলতি মাসেই জাতীয় সংসদে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ইয়াবাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির ‘ক-শ্রেণির’ বা ক্লাস-এ মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কঠোর অভিযান চালানো হয়েছিল। ফিলিপাইনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানের আদলে পরিচালিত ওই পদক্ষেপে কয়েক মাসের ব্যবধানে দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, সে বছর নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৬৬। বিচারবহির্ভূত এমন হত্যাকাণ্ড ও হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সে সময় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ওই অভিযানে দেশের দরিদ্র এলাকাগুলোতে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব কঠোর পদক্ষেপ মাদকের বিস্তার রোধে খুব একটা কাজে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মাদকের ব্যবহার কমাতে হলে সর্বাগ্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন প্রয়োজন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ও ঢাকার নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আরিফুজ্জামান জানান, দেশে বর্তমানে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। রোগীর চাপ এত বেশি যে, সরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসককে ঘণ্টায় ২০ জন পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়। এছাড়া মানসম্পন্ন মনোবিজ্ঞানীরও তীব্র সংকট রয়েছে। ২০১৮-১৯ সালের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন এমন ৯০ শতাংশ মানুষই সেবার আওতার বাইরে থাকছেন।
চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবার পাশাপাশি দেশে হেরোইন, বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন বা ওমোরফোন বড়ির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিষণ্নতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিংবা বন্যা ও মহামারির মতো বিপর্যয়ের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। আসক্তদের কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করলেও অনেকেই মাদকের ব্যয় মেটাতে একপর্যায়ে কারবারিতে পরিণত হচ্ছেন।
মাদকের এই বিস্তারের পেছনে আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্কও বড় ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) মতে, নব্বইয়ের দশকে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আগে ইয়াবা মূলত এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ট্রাকচালকদের মতো শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে প্রথম ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ হয়। বর্তমানে থাইল্যান্ড, লাওস ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা বা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইউএনওডিসির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার মূল উৎপাদক হিসেবে মিয়ানমারকেই চিহ্নিত করা হয়।
মাদকের করাল গ্রাসের একটি করুণ দৃষ্টান্ত হলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ‘মেটালফ্রিক’ ছদ্মনামে পরিচয় দেন। একসময় পরম মমতায় পোষা পাখির যত্ন নেওয়া এই ব্যক্তি ইয়াবার ছোবলে এখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। নিজের অগোছালো ঘরে শুয়ে তিনি জানান, ইয়াবা তার মানসিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। টিনফয়েলে পুড়িয়ে ইয়াবার ধোঁয়া নেওয়া এই ব্যক্তি টানা তিন দিন জেগে থাকার পর একটানা ১২ ঘণ্টারও বেশি ঘুমান।
তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আসক্তরা সাধারণত সিগারেট বা গাঁজা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে ইয়াবায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার ছলে শুরু করা এই মাদক মানুষকে ‘পশুতে পরিণত করে’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাজারে এখন সস্তা ও দামি—দুই ধরনের ইয়াবাই পাওয়া যায়। সস্তা ইয়াবা ব্যবহারকারীদের দাঁত ও মুখের মারাত্মক ক্ষতি করে। নিয়মিত ব্যবহারে স্ট্রোক বা খিঁচুনির মতো সমস্যা দেখা দেয়। তিনি জানান, আফিম বা হেরোইনের জায়গা এখন পুরোপুরি ইয়াবার দখলে। ঢাকার মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে এই বড়ি বিক্রি হতে দেখা যায়।

মাদক বিস্তারের পেছনে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশ এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতাও প্রকট। ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করে। এসব উত্থান-পতনের মধ্যে দেশের বহু তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
মেটালফ্রিকের মতো আসক্তদের ব্যক্তিজীবনও নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা। তিনি জানান, তার প্রয়াত বাবাকে একসময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান করা হলেও পরে বন্ধুরা তাকে ভুয়া বলে কটূক্তি করেছে। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই ব্যক্তি এখন ইনস্টাগ্রামে ফিলিস্তিন ইস্যু বা পশ্চিমা বিশ্বের বৈষম্য নিয়ে ভিডিও দেখে সময় কাটান। কিম জং-উন থেকে শুরু করে ভ্লাদিমির পুতিন বা উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন তিনি।
অর্থনৈতিক বৈষম্যকে মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন মেটালফ্রিক। মাথা গোঁজার ঠাঁই ও নিশ্চিত খাবারের নিশ্চয়তা থাকায় নিজেকে ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিত্তবানদের হাতেই মাদকাসক্ত হওয়ার মতো অফুরন্ত সময় থাকে। ইয়াবাকে তিনি একটি ‘ধীর বিষপ্রয়োগ ও নিখুঁত ধ্বংসের পরিকল্পনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, দিনের পর দিন না ঘুমানোর কারণে একজন নিয়মিত সেবনকারী খুব বেশিদিন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারেন না।
/দ্য আইরিশ টাইমস-এর প্রতিবেদন

