ছাত্রলীগের প্রতি মায়াকান্না দেখানো সাংবাদিকদের জড়ো করে ব্যবস্থা নেব: রাকসু ভিপি

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৭

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাম্প্রতিক মারধর ও হামলার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। সাংবাদিকদের সংবাদে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের প্রতি পক্ষপাত ও ‘মায়াকান্না’র অভিযোগ তুলে তিনি বলেছেন, যারা ছাত্রলীগকে রক্ষা করে সংবাদ প্রকাশ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। গত সোমবার বিকেলে রাকসু কার্যালয়ে কতিপয় শিক্ষার্থীর হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের শব্দচয়ন নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান রাকসু ভিপি। তিনি বলেন, ‘আপনারা কালকে ছাত্রলীগকে ডিফেন্স করে (পক্ষ নিয়ে) অনেকে নিউজ করেছেন। এই সাংবাদিক এখানেও অনেকে আছে। আমরা সেগুলো জড়ো করে করে এখানে ব্যবস্থা নেব। এত মায়াকান্না করা যাবে না।’ সাধারণ শিক্ষার্থীরা হামলাকারীদের প্রতিহত করলেও সেটিকে সংবাদমাধ্যমে ‘হামলা’ হিসেবে কেন প্রচার করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারও সাংবাদিকদের ভূমিকার সমালোচনা করেন। জুলাই অভ্যুত্থানে গণমাধ্যমের কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা শব্দ দিয়ে মানুষকে তৈরি করতে এবং ধ্বংস করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের এই পদক্ষেপকে ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে কেন তুলে ধরা হচ্ছে না, সে বিষয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এদিকে, সোমবার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে মারধরের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন ভিপি মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানান, ২০-২৫ মিনিট পড়াশোনা নষ্ট হওয়ার বিষয়ে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী তাদের কাছে অভিযোগ করেনি। উল্টো এই ঘটনা নিয়ে ছাত্রদলের ডাকা মানববন্ধনের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। ভিপি জানান, রাকসু ভবনে হামলার সময় ছাত্রলীগের চেয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি বেশি ছিল বলে রাকসু জিএস তাকে নিশ্চিত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিএনপিপন্থি হলেও অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিচার করা হবে বলে তিনি জানান।

সংবাদ সম্মেলন থেকে রাকসুর পক্ষ থেকে ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নারী শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, রাকসু ভবন ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার তদন্ত এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার ও সন্ত্রাস বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে যারা নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানানো হয়। এ সময় রাকসুর এজিএস এস এম সালমান সাব্বির, মিডিয়া সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, পুরো ঘটনার সূত্রপাত সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলম ওই ছাত্রীকে ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেন। গত রোববার রাতে এ নিয়ে প্রক্টর দপ্তরে বৈঠক চলার সময় অভিযুক্ত মহসিনের পক্ষে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসান নামের তিন শিক্ষার্থী প্রক্টরের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান।

পরদিন সোমবার এ বিষয়ে পুনরায় বৈঠক বসলে আনাসকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী আখ্যা দিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এর কিছুক্ষণ পরই আনাস ও তার সহযোগীরা রাকসু ভবনে গিয়ে জিএস সালাউদ্দিন আম্মার এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিবের ওপর হামলা চালান। এতে নাজমুস সাকিব আহত হন।

রাকসু ভবনে হামলার পর অভিযুক্ত আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নিলে সেখানে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের বাগ্‌বিতণ্ডা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে তারা পাঠকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নিলে সেখানে ঢুকে তাদের ওপর দফায় দফায় মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’–সংক্রান্ত একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন