আল-জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন

ইসরায়েলে প্রভাব হারাচ্ছে নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৭:১৩

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রাজনীতির মূল ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার মূল দাবিই ছিল, আমেরিকার সাথে এমন গভীর বোঝাপড়া বজায় রেখে ইসরায়েলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কেবল তারই আছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার সেই বহু আলোচিত এবং শক্তিশালী কার্ডটিই যেন ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

নেতানিয়াহু ছোটবেলায় ও কৈশোরে যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। আমেরিকান উচ্চারণে কথা বলতে তার কোনো অসুবিধা হয় না। রাজনীতির মহলে অনেকেই বলেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মন জয় করতে জানেন। একের পর এক প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করে ইসরায়েলের পক্ষে এবং নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে সমর্থন আদায় করেছেন তিনি।

এবারও তিনি আশা করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক সফল হলে দেশে তার জনপ্রিয়তা বাড়বে। কিন্তু সময়টা খুবই নাজুক। যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর গ্রহণযোগ্যতা এখন অনেকের মতে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম।

একসময় মনে হয়েছিল, ট্রাম্পই ইসরায়েলের, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় সমর্থক। ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে রাজি হয়ে ট্রাম্প সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছিলেন। তিনিই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের মতামত ছাড়াই ইরানের সঙ্গে সমঝোতার কথা ভাবছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনাও বেড়েছে। ফলে ইসরায়েলে অনেকেই মনে করছেন, নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ আর আগের মতো কাজ নাও করতে পারে।

এ অবস্থায় নেতানিয়াহু নিজেও চাপের মুখে আছেন। আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন। দেশে দুর্নীতির মামলায় তার বিচার চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি সংঘাতও এখনো অমীমাংসিত।

লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহরন ব্রেগম্যান বলছেন, ভুল হোক বা সঠিক, যুক্তরাষ্ট্রে অনেকের ধারণা নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে এমন এক যুদ্ধে টেনেছেন, যা এড়ানো যেত। আর সেই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। এখন আর কেউ তাকে সবচেয়ে বিচক্ষণ নেতা বলে তুলে ধরবে না। সেই সময় শেষ।

এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন। মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এটাই তার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। অনেকেই একে তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি তুলে দেশের মানুষকে দেখানো যে সম্পর্ক এখনো আছে।

কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দুজনের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সফল হবে, এমনকি সরকারও পতন হতে পারে। সেই আশা পূরণ হয়নি।

কংগ্রেসেও নেতানিয়াহু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি তার নমনীয় মনোভাব সমালোচিত। একজন মার্কিন সিনেটরকে বিচারবহির্ভূতভাবে আটক করার ঘটনায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয় বিবেচনা করছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তিতেও এগোচ্ছে। এসব বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাস আল-জাজিরাকে বলেছেন, এ সফরের আসল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। নেতানিয়াহু বলছেন, প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতেই এসেছেন। কিন্তু সবাই জানে, এর চেয়ে বেশি কিছু আছে।”

পিঙ্কাসের মতে, নেতানিয়াহু দুটি জিনিস চাইছেন। এক, মিত্র ও সমালোচকদের বোঝানো যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো মজবুত। দুই, চলমান দুর্নীতির মামলায় ট্রাম্প যেন তাকে ক্ষমা করার আহ্বান জানান। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর পক্ষে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ করেছিলেন। সেই স্মৃতি হয়তো নেতানিয়াহু আবার জাগাতে চাইছেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী শিবিরেও এখন সমালোচনা বাড়ছে। পডকাস্টার টাকার কার্লসন, সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন তারাও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জো রোগানের পডকাস্টে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েল সরকারের কেউ কেউ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকাশ্যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সৌজন্য দেখা গেলেও ব্যক্তিগত আলোচনায় ট্রাম্পের মনোভাব অনেক বেশি সতর্ক ও স্বার্থকেন্দ্রিক হবে। সোমবার সাংবাদিকরা তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে নেতানিয়াহুর আপত্তি নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন। ট্রাম্পের জবাব ছিল স্পষ্ট, আমাদের কী বিক্রি করা উচিত, সেটা আমাকে কেউ বলে দিতে পারে না।

আহরন ব্রেগম্যান আরও বলেন, নেতানিয়াহু এমন সময় ওয়াশিংটনে গেছেন, যখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের অনেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি এখন অনেকটাই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন।

ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী ও নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অতীত রেকর্ড ভালো। কিন্তু তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও নষ্ট করেছেন। বারাকের মতে, সমালোচনা শুধু জাতীয়তাবাদীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকান পার্টির মধ্য ডানপন্থী অংশের অনেকেও এখন তার বিরুদ্ধে।

বারাক আরও বলেন, হতে পারে ট্রাম্প বলবেন, যুদ্ধের সময় নেতানিয়াহু ভালো নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এখন ইসরায়েলের নতুন নেতৃত্বের সময় এসেছে। এরপর তিনি অন্য ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন কাউকে সমর্থন জানাতেও পারেন।

প্রকাশ্যে কোনো বড় মতবিরোধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেকে একমাত্র ভরসাযোগ্য নেতা হিসেবে তুলে ধরা নেতানিয়াহুর জন্য আগের মতো সহজ নাও হতে পারে। অথচ আসন্ন নির্বাচনে এটিই তার অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি।

ইত্তেফাক/এবিএস