বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

তীব্র গরমের কারণে ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের ক্ষতি ১৮০ কোটি ডলার

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৯

বিশ্বব্যাংক ও সহযোগী সংস্থাগুলোর যৌথভাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তীব্র গরম ও তাপদাহের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরাসরি ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি (১.৩–১.৮ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির (GDP) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে এই ক্ষতির হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশিত ‘A Livable Future: Protecting Jobs and Growth from Extreme Heat in South Asia's Cities’ শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (FCDO), সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এবং গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (GFDRR)। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শহরগুলোতে তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তাপদাহের কারণে হারানো কর্মঘণ্টাকে পূর্ণকালীন চাকরির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শহরগুলোর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ঢাকায় বার্ষিক মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। ২০৫০ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়ে ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান হতে পারে। আর ২০৮০ সালে এই অপচয় বেড়ে ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাবে, যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। তুলনামূলকভাবে ২০৮০ সালে তাপদাহজনিত কর্মসংস্থান ও কর্মঘণ্টার এই ক্ষতি কলকাতার ক্ষেত্রে হবে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার—অর্থাৎ ঢাকার ক্ষতির মাত্রা দিল্লি ও কলকাতার চেয়েও অনেক বেশি।

বাংলাদেশসহ কয়েকটি দক্ষিণ এশীয় দেশের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) খাত তাপদাহজনিত কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাপদাহ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তৈরি পোশাক খাত মিলিয়ে প্রায় ৬৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রপ্তানি আয় হারাতে পারে। তবে একটি ইতিবাচক বিষয় হলো, সরকারের 'গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড'-এর উদ্যোগে ২০১৬ সাল থেকে পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। এরই সুবাদে বাংলাদেশের ২৭০টিরও বেশি কারখানা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ LEED সনদ অর্জন করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি প্রশমনে ভূমিকা রাখবে।

তীব্র তাপদাহ দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জাতীয় অবকাঠামোর ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের তাপদাহ চলাকালে দেশে প্রতিদিন সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬,২৩৭ মেগাওয়াট, কিন্তু বিপরীতে গড়ে উৎপাদন সম্ভব হয়েছিল ১৩,৯৮৮ মেগাওয়াট। প্রায় ২,২০০ মেগাওয়াটের এই বিশাল ঘাটতি এবং প্রাথমিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশজুড়ে কঠোর লোডশেডিং করতে হয়েছিল, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদনে। তাছাড়া ২০২৪ সালের প্রচণ্ড গরমে দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় মহাসড়কের বিটুমিন গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, যা সড়ক অবকাঠামো সংস্কারে সরকারের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসভিত্তিক তাপদাহ ব্যবস্থাপনায় ন্যূনতম বিনিয়োগেও বহুগুণ সুফল পাওয়া সম্ভব। ভারতের আহমেদাবাদের 'হিট অ্যাকশন প্ল্যান'-এর মতো আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাপনায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে ৫০ ডলার সমমূল্যের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা অর্জন সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশও এ ধরনের আধুনিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দেশে প্রথমবারের মতো পূর্বাভাসভিত্তিক তাপপ্রবাহ সহায়তা কর্মসূচি শুরু করে, যার অধীনে অতি-ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪,০০০ পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি ৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

অপরদিকে, তীব্র গরমে সারা দেশে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার এসি বিক্রি হয়, যা গত ৫ বছরের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এসি কেনার এই খরচ পারিবারিক বাজেটে চাপ বাড়ালেও বিশেষজ্ঞদের মতে দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কর্মক্ষমতা হ্রাসজনিত ক্ষতি কমাতে সাময়িক সহায়তা করছে।

প্রতিবেদনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদি সময়মতো তাপসহনশীল ও কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের সার্বিক জিডিপিতে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নগর উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মিং ঝাং জানান, বিশ্বব্যাংকের বর্তমান উন্নয়ন কৌশলে তাপদাহ সহনশীলতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতি এড়াতে সরকারকে এখনই অবকাঠামো ও আগাম ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংকট কাটাতে প্রতিবেদনে ১৫টি নির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো তাপদাহের সময় কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি তহবিল বা বরাদ্দে তাপদাহকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাপদাহ মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী শর্তে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ব্যবস্থা করা।

ইত্তেফাক/এএম