চলে গেলেন সমসাময়িক বাংলা ভাষার প্রধানতম কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান। ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম নেওয়া এ লেখক গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন) তিনি দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।
রিজিয়া রহমান কিছুদিন একটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ছিলেন বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের কার্যপরিচালক এবং জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনা বোর্ডের ট্রাস্টি। স্বামী মো. মীজানুর রহমান ছিলেন খনিজ ভূতত্ববিদ। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে আবদুর রহমান। ছেলে আবদুর রহমান জানান, উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরে তাদের বাসার কাছের মসজিদে শুক্রবার আসরের পর রিজিয়া রহমানের জানাজা শেষে মিরপুর কবরস্থানে ভাইয়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
এ কথা সাহিত্যিকের মৃত্যুতে শোকার্ত দেশের কবি-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মিগণ। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এ লেখিকার মৃত্যুতে বলেন, ‘তার মৃত্যু এদেশের সাহিত্য অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য খ্যাতনামা এ ঔপন্যাসিককে এদেশের মানুষ দীর্ঘকাল স্মরণ রাখবে।’
শব্দের ব্যবহার, ভাষা, আখ্যান রচয়িতা, বিষয়বৈচিত্র্য—যে বিবেচনাই করা হোক না কেন, বাংলা ভাষায় এ রকম বহুরৈখিক শক্তিমান লেখক বিরল। কাজ করে গেছেন আমৃত্যু, নিভৃতে এবং তার কলম কখনো প্রাণহীন হয়ে ওঠেনি। তার প্রতিটি লেখা অভিনব এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে পাঠককে। তিনি সারাজীবন বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের জন্য এক অফুরান সমৃদ্ধ আল্লেখ্য রচনা করে গেছেন।
রিজিয়া রহমানের লেখার শুরুটা খুব ছোটোবেলায়। তখন পড়েন পঞ্চম শ্রেণিতে। কথাসাহিত্য পরবর্তীতে জীবনের ব্রত হলেও প্রথম লেখাটি ছিল পদ্য এবং সেটি ছাপা হয় ‘সত্যযুগ’ পত্রিকার ছোটোদের পাতায়। প্রথম গল্পটিও ছাপা হয়েছিল ‘সত্যযুগ’-এ, ছোটোদের বিভাগেই। বড়োদের পাতা বিবেচনা করলেও রিজিয়া রহমানের প্রথম লেখা কবিতাই; ছাপা হয় দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য বিভাগে। এরপর ‘ললনা’ পত্রিকায় উপন্যাস ‘ঘর ভাঙা ঘর’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে এবং এর মাধ্যমে বাংলা কথাসাহিত্যে সংযোজিত হয় এক নতুন অধ্যায়ের।
বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ছিলেন ডাক্তার। রিজিয়া রহমানের জন্মের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংযোগ রয়েছে। ১৯৩৯ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এ লেখিকার শিশুকাল আবৃত ছিল সাইরেন, বোমা, ধোঁয়া, শব্দ, দ্রুতগামী মিলিটারি লরি, উদ্বাস্তু মানুষ এমনসব দৃশ্যে মোড়ানো। সাইরেন বাজলেই কলকাতা পথ ঘাটের মানুষ দ্রুত ছুটে পালাতে শুরু করত। বোমা আর অ্যান্টি অ্যায়ারক্রাফটের শব্দ শহর কাঁপায়। এমন এক অস্থির আবহের ভেতর বেড়ে উঠেছিল একটি ছোট্ট বালিকা, নাম জোনাকি। বাবার প্রিয় এ জোনাকি পরবর্তীতে বাংলা কথাসাহিত্যের প্রভাবশালী লেখক রিজিয়া রহমান। আবার দেখা যাচ্ছে—এ লেখকের জীবন এক বিরতিহীন জার্নি। যার শুরুটা হয়েছিল অনেক পুরুষ আগে।
মুন্সী আব্দুল খালেকের একমাত্র ছেলে আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ডাক্তারি পেশার সুবাদে আসেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। চাকরির সুবাদে এখানে মরিয়াম বেগম ও আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিকের পরিণয় ঘটে। ’৪৭-র দেশ ভাগের পর এ পরিবার বাংলাদেশে থিতু হয়। আবার যদিও এ পরিবারের অনেকেই ছড়িয়ে পড়েন পৃথিবীর নানা দেশে।
রিজিয়া রহমানের লেখাপড়ার হাতেখড়ি বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরে। তারপর বাবার চাকরি সূত্রে নানা জায়গায় ছুটতে হয়েছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যায়ন তার কোনোকালেই ঘটেনি। ১৯৫২ সালে বাবার মৃত্যুর পর মামার চাকরিস্থল চাঁদপুরের এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এর এক বছর পরেই প্রাইভেটে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন।
তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের তালিকা দীর্ঘ। তিনি কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, শিশুদের জন্য লিখেছেন এবং সাহিত্যের এসব মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে স্থাপন করতে পেরেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—গল্পগ্রন্থ : অগ্নিস্বাক্ষরা (১৯৬৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৭৮); উপন্যাস : ঘর ভাঙা ঘর (১৯৭৪), উত্তর পুরুষ (১৯৭৭), রক্তের অক্ষর (১৯৭৮), বং থেকে বাংলা (১৯৭৮), অরণ্যের কাছে (১৯৭৯), শিলায় শিলায় আগুন (১৯৮০), সূর্য সবুজ রক্ত (১৯৮১), একাল চিরকাল (১৯৮৪), হে মানব মানবী (১৯৮৯), হারুন ফেরেনি (১৯৯৪)’ উেস ফেরা (২০০৯), আলবুর্জের বাজ (২০১০), পবিত্র নারীরা (২০১০), সীতা পাহাড়ে আগুন (২০১০)। আত্মজীবনী : নদী নিরবধি (২০১১)। রম্যরচনা: খাওয়া-খায়িরর বাঙালি। শিশুসাহিত্য : আজব ঘড়ির দেশে, ঝিলিমিলি তারা, মতিশীলের বাড়ি ও অন্যান্য ও গল্প। অনুবাদ : সোনালী গরাদ (১৯৯৫)।
তিনি তার কাজের জন্য নানা পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক ইত্যাদি।
