সততা হারাইলে গবেষণা থাকে না

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩০

একটি মিথ্যা কখনো একা জন্ম লয় না-উহার সহিত জন্ম লয় আর একটি মিথ্যা, তারপর আরও অনেক। একসময় মিথ্যাগুলি পরস্পরের কাঁধে হাত রাখিয়া এমন কিছু নির্মাণ করে, যেইখানে সত্যকেই অস্বাভাবিক বলিয়া মনে হয়। গবেষণার জগৎকে আমরা দীর্ঘকাল এমন এক সত্যনিষ্ঠ অঙ্গন বলিয়া ভাবিয়া আসিয়াছি; কিন্তু সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছে, ২০১৯ হইতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকী হইতে প্রত্যাহার করা হইয়াছে। অভিযোগগুলির মধ্যে রহিয়াছে ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি, একই উপাত্ত পুনর্ব্যবহার, উদ্ধৃতি-সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি এবং অর্থের বিনিময়ে লেখকস্বত্বের বাণিজ্য।

গবেষণাপত্র প্রত্যাহার একটি গবেষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলা যাইবে কি? ইহা একই সঙ্গে একটি দেশের একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতার উপরও আঘাত। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা একটি দেশের জ্ঞানচর্চার পরিচয় বহন করে। সেই গবেষণাই যদি পরে জালিয়াতি বা অনিয়মের দায়ে প্রত্যাহৃত হয়, তাহা হইলে বিদেশি সম্পাদক, পর্যালোচক ও গবেষকদের নিকট সমগ্র দেশের গবেষকসমাজ সন্দেহের চোখে প্রতিভাত হয়। ভবিষ্যতে সৎ ও মেধাবী গবেষকেরও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন কঠিন হইয়া পড়ে। একটি মানুষের অপরাধ অনেক সময় একটি জাতির সুনামকে কলঙ্কিত করিয়া দেয়। প্রশ্ন হইল, কেন এই অবক্ষয়? ইহার উত্তর কেবল ব্যক্তির লোভে সীমাবদ্ধ নহে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি, র‍্যাংকিং, আর্থিক প্রণোদনা, 'সেরা গবেষক' উপাধি এবং দ্রুত প্রকাশনার অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা গবেষণাকে অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞানসাধনা হইতে সংখ্যার খেলায় পরিণত করিয়াছে। গবেষণার গুণগত উৎকর্ষ অপেক্ষা কতগুলি প্রবন্ধ প্রকাশিত হইল, তাহাই যেন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ডে পরিণত হইয়াছে। ফলত, গবেষণা আর সত্যের অনুসন্ধান থাকে না-ইহা পরিণত হয় জীবনবৃত্তান্ত অলংকরণের কৌশলে। পরীক্ষাগারে তথ্যকে বিকৃত করা, অন্যের লেখা চুরি করা অথবা ভুয়া মূল্যায়নের আশ্রয় লওয়া কেবল পেশাগত অনৈতিকতা নহে। ইহাকে জ্ঞানের বিরুদ্ধে অপরাধ বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। কারণ, বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রাথমিক ভিত নির্মিত হয় বিশ্বাসের উপর। সেই বিশ্বাস ভাঙিয়া গেলে সমাজের উন্নয়নও ভঙ্গুর ভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া থাকে।

এই সংকটের আর একটি উদ্বেগজনক দিক হইল জবাবদিহির অভাব। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সতর্ক করিয়াই দায় শেষ করিয়াছে, কোথাও আবার কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালাই ছিল না বলিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় নাই। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গবেষণা জালিয়াতি গুরুতর একাডেমিক অপরাধ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, যেই দেশে গবেষণার সততা রক্ষার কঠোর ব্যবস্থা থাকে না, সেই দেশে গবেষণার উৎকর্ষও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অতএব, কেবল দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা নহে, এখন প্রয়োজন গোটা গবেষণা-ব্যবস্থার সংস্কার। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন গবেষণা-নৈতিকতা কমিটি গঠন, গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার পূর্বে বাধ্যতামূলক চৌর্যবৃত্তি পরীক্ষা, গবেষণা-উপাত্ত সংরক্ষণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করিতে হইবে। পদোন্নতি বা পুরস্কারের ক্ষেত্রে কেবল গবেষণার সংখ্যা নহে, তাহার গুণমান, প্রভাব এবং সততাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হইবে।

ইহার সহিত গবেষকদেরও স্মরণ রাখা প্রয়োজন, গবেষণা কোনো শিল্পোৎপাদনের কারখানা নহে। একটি সৎ গবেষণা শত ভুয়া গবেষণার চাইতে অধিক মূল্যবান। একটি সত্য আবিষ্কার হাজার কৃত্রিম উদ্ধৃতির চাইতে অধিক স্থায়ী। মনে রাখিতে হইবে, একটি জাতির উন্নতি হয় সত্যের প্রতি অবিচল আনুগত্যে। গবেষণার সততা রক্ষা করা মানে কেবল কয়েকটি গবেষণাপত্র রক্ষা করা নহে-ইহা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক সম্মানও সমানভাবে রক্ষা করিবার শামিল। চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে সাময়িক সময়ের জন্য কাহারো চোখে ধুলো দেওয়া যায়; কিন্তু যে কোনো সময় ধরা পড়িবার আশঙ্কা থাকিয়াই যায়। সুতরাং গবেষণাসহ যে কোনো ক্ষেত্রে সততার কোনো বিকল্প নাই।

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন