ধর্মীয় লেবাসধারীদের নৈতিক অবক্ষয় ও নারী কেলেঙ্কারি: শায়খ আহমাদুল্লাহর চোখে কারণ ও প্রতিকার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫৯

সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে নৈতিক স্খলন ও বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বাহ্যিক ধর্মীয় লেবাস বা দাড়ি-টুপিধারী ব্যক্তিদেরও এ ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি এক লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে জনৈক ব্যক্তি ঠিক এই বিষয়টি তুলে ধরে প্রশ্ন করেন—দাড়ি-টুপিধারীদের মাঝেও কেন আজ নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে এবং এর প্রতিকারই বা কী?

উক্ত প্রশ্নের অত্যন্ত সুচারু ও প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব দিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা ও চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ। তার বক্তব্যের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

আলোচনার শুরুতে শায়খ আহমাদুল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন যে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতকে এ বিষয়ে সতর্ক করে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফেতনার বিষয় রেখে গেলাম না।” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “বনি ইসরাইলের প্রথম ফেতনা বা বিভ্রান্তির সূচনাও হয়েছিল নারীর মাধ্যমে।”

তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই হাদিসগুলোর উদ্দেশ্য কোনোভাবেই নারীদের দোষারোপ করা নয়; বরং পুরুষদের সৃষ্টিগত ও চারিত্রিক দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করে তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে পুরুষরা এই খাতেই সবচেয়ে দ্রুত পদস্খলনের শিকার হতে পারে।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উল্লেখ করে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তির ব্যবস্থার চেয়ে অপরাধের পথ রুদ্ধ করার ওপর ইসলাম বেশি জোর দেয়। পবিত্র কুরআনে ব্যভিচারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, “তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না।” (সুরা বনি ইসরাইল: ৩২)

অন্যান্য অনেক পাপাচারের ক্ষেত্রে কেবল 'অপরাধ করো না' বলা হলেও ব্যভিচারের ক্ষেত্রে এর 'নিকটবর্তী হতে নিষেধ' করা হয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, একজন পুরুষ যখন কোনো পরনারীর সৌন্দর্য অবলোকন করে কিংবা অহেতুক কথাবার্তা ও মেলামেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন সে আস্তে আস্তে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। এই আসক্তিই পরবর্তীতে তাকে বাস্তব পাপাচারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই শরিয়ত এসব পাপের ফাঁদ থেকে বাঁচাতে দৃষ্টির সংযম ও শালীনতার রূপরেখা দিয়েছে।

দাড়ি-টুপি বা দ্বীনি লেবাসধারীদের পতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, তাদের এই পদস্খলনের মূল কারণ হলো— আল্লাহর ভয় বা তাকওয়ার ঘাটতি, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও নিজেকে অপ্রয়োজনে ফেতনার মুখোমুখি দাঁড় করানো।

কেউ যদি মনে করেন যে তার ইবাদত বা দ্বীনি জ্ঞান তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাপাচার থেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং এই অহংকারে তিনি পরনারীর সঙ্গে অবাধ মেলামেশা বা অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ বজায় রাখেন, তবে একসময় তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। বর্তমান ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় কেবল প্রবৃত্তির পূজার শিক্ষা দেওয়া হলেও ইসলাম আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়।

প্রতিকার ও আত্মরক্ষার উপায়

এই আত্মিক ও সামাজিক ব্যাধি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শায়খ আহমাদুল্লাহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন:

১. ঈমানি শক্তি ও তাকওয়া অর্জন: মনে সর্বদা এ কথা জাগ্রত রাখা যে, নির্জনতা বা লোকচক্ষুর অন্তরালে যা-ই করা হোক না কেন, আল্লাহ তাআলা তা সরাসরি দেখছেন।

২. সুন্নাহসম্মত জীবনযাপন ও যথাসময়ে বিবাহ: চরিত্র কলুষমুক্ত রাখতে যথাসময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং পরিবারের সান্নিধ্যে থাকা জরুরি।

৩. লজ্জাস্থান ও মুখের হেফাজত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই রানের মধ্যবর্তী অঙ্গের (লজ্জাস্থান) হেফাজত করবে, তিনি তার জান্নাতের জিম্মাদার হবেন।

৪. ফেতনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা: নিজের প্রতি অতিবিশ্বাসী না হয়ে যেকোনো অবৈধ যোগাযোগ ও প্রলোভনের ক্ষেত্র থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকা।

পরিশেষে তিনি বলেন, সুরা মুমিনুনে সফল মুমিনদের অন্যতম প্রধান গুণ হিসেবে চারিত্রিক পবিত্রতা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের কথা বলা হয়েছে। নিজেদের ইজ্জত-সম্মান এবং ইহকাল ও পরকালের মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে নবীজির (সা.) সুন্নাহ ও দিকনির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

ইত্তেফাক/এএম