সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেয়নি সংসদের বিরোধী জোট। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করছে ক্ষমতাসীন জোট। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত ১২ সদস্যবিশিষ্ট সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি আজ মঙ্গলবার প্রথম বৈঠকে বসছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বেলা ১২টায় অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, আজকের বৈঠকে পরিচিতি ছাড়াও কমিটির কর্মপরিধি ও কর্মকৌশল এবং সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হবে। মূলত, দ্বিতীয় বৈঠক থেকে সংবিধান সংশোধন নিয়ে সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন তৈরির কার্যকর আলোচনা শুরু হবে। চলতি ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ। কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই কমিটির কার্যপরিধি হলো ‘সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্ত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ’। তবে, কতদিনের মধ্যে কমিটিকে সংসদে প্রতিবেদন দিতে হবে, সেটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচ জনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে কারো নাম দেয়নি বিরোধী দল। সংসদে এই কমিটি গঠনের দিনই তা প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বলেছিলেন, এধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের ধারণাগত মতপার্থক্য আছে। সংশোধন নয়, তারা চান সংবিধান সংস্কার।
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে সংসদে ঐ দিন এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব তুলেছিলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। চিফ হুইপ সেদিন সংসদকে জানান, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করা হলেও তারা কোনো সদস্যের নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি সদস্যপদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। তবে, এখন পর্যন্ত বিরোধী দল নাম দেয়নি।
বিশেষ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলিউল্লাহ।
চিফ হুইপের বক্তব্যের পর ঐ দিন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছিলেন, চিফ হুইপ একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। তারা কখনোই বলেননি—এ কমিটিতে নাম দেবেন। তারা জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি।’
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সেদিন সংসদে বলেছিলেন, বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে, তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। তাই বর্তমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিরোধী দলের দুটি শপথের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ, এটি কালারেবল লেজিসলেশন। আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে যদি সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। সংসদেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে। পরে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে।
প্রসঙ্গত, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জাতীয় সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা। তবে, বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।

