সংযুক্তিতে ঢাকায় আসতে চান অধিকাংশ চিকিত্সক

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০০

রাজধানীর সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে সংযুক্তিতে নিয়োগে তদ্বিরে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ঐসব চিকিত্সকের কোনো প্রয়োজন নেই, কাজও নেই, তবুও সংযুক্তিতে তারা ঐ হাসপাতালে এসে যোগদান করছে। এই সংযুক্তি তদ্বির ঠেকাতে পারছেন না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।  অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্তি সিন্ডিকেট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকার একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেন, কোনো হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিত্সকের কিংবা চাহিদার তুলনায় চিকিত্সকের সংখ্যা অপ্রতুল। সেক্ষেত্রে হাসপাতাল পরিচালক চাহিদা অনুযায়ী কিংবা শূন্য পদের বিপরীতে চিকিত্সক তালিকা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রস্তাব পাঠাবেন এবং সে অনুযায়ী অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে—এটাই নিয়ম। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাইরে থেকে সংযুক্তিতে বিপুলসংখ্যক চিকিত্সককে ঢাকার বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে মন্ত্রণালয় কিংবা সরাসরি অধিদপ্তর থেকে নিয়োগ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এর পিছনে তদ্বির বাণিজ্য কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে শূন্যপদ থাকলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিতে পারে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়। অনেক ক্ষেত্রেই যেসব চিকিত্সকের প্রয়োজন নেই, শুধু ঢাকায় থাকার জন্যই তারা আসছেন বলে একাধিক কর্তৃপক্ষ জানান। শুধু যে এ সরকারের আমলে সংযুক্তিতে ঢাকায় আসার বাণিজ্য হচ্ছে তা নয়, বিগত সরকারের আমলেও এই বাণিজ্য ওপেন ছিল। অথচ ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলা পর্যন্ত মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অন্যান্য বিশেষায়িত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের শূন্য পদ রয়েছে। ঐসব হাসপাতালে কিংবা মেডিক্যাল হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নিয়োগ দিলেও কয়েক মাসের মধ্যে তদ্বির সংযুক্তিতে কিংবা নানা অজুহাতে সপ্তাহে দুই/এক দিন হাসপাতালে থেকে সিংহভাগ সময় তারা ঢাকায় থাকেন অথবা বিভাগীয় শহরে অবস্থান করেন। এসব কারণে ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চিকিত্সা কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও নানা অজুহাতে তা করা হয়নি। ফলে জটিল তো বটেই, এমনকি সাধারণ রোগের চিকিত্সার জন্যও রোগীরা ঢাকায় চলে আসছে। রাজধানীর সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে কোনো বিছানা খালি নেই। কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল তিন/চার সপ্তাহ অপেক্ষা করেও ভর্তি হতে পারছে না বিপুলসংখ্যক রোগী। তারা প্রতিদিন ভর্তির জন্য ঐসব হাসপাতালে যান। চিকিত্সক ‘দুঃখিত বিছানা খালি নেই’ বলে রোগীকে পর দিন আসতে বলেন। রোগী নিরুপায় হয়ে অনেক বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা কিংবা অপারেশন করতে বাধ্য হন এবং  চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন।

একাধিক হাসপাতাল পরিচালক জানান, রাজধানীর নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর প্রচণ্ড চাপ। সময়মতো কেবিন, বিছানা কিংবা আইসিইউতে রোগী ভর্তি করা সম্ভব হয় না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেন, সংযুক্তিতে কিংবা ঢাকায় থাকার জন্য প্রেষণে আসার প্রয়োজন নেই। তারা কয়েক বছর ঢাকার বাইরে সরকারি কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাসেবা দিলে রোগীরা সুচিকিত্সা পাবেন আর চিকিত্সকদের ঢাকায় আসার চাপও অনেক গুণ কমে যাবে। বেফারেল সিস্টেমও চালু করা যেতে পারে বলে একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক মত প্রকাশ করেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ১৭৪ জন সংযুক্তিতে চিকিত্সক যার অধিকাংশের প্রয়োজন নেই বলে একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন। একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেন, তার হাসপাতালে রাজধানীর একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে দুই জন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অর্থাত্ সহকারি ও সহযোগী অধ্যাপককে সংযুক্তিতে দেওয়া হয়েছে। অথচ তাদেরকে এই হাসপাতালে আনার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ঐ মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষক ও চিকিত্সক সংকট রয়েছে। শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা তিনগুণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সংযুক্তিতে আসা চিকিত্সকদের তালিকা করা হচ্ছে। ঐ তালিকার পর সবার সংযুক্তির আদেশ বাতিল করা হবে এবং তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানো হবে। একই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (শিক্ষক) অধ্যাপক ডা. সুমন নাজমুল বলেন, শিক্ষকদের একটি বড় তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ তালিকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে করা হলেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দ্রুত তাদেরকে সকল সরকারি মেডিক্যাল কলেজে নিয়োগ হবে বলে তিনি জানান। 

ইত্তেফাক/এনএন