জান্নাত মুমিনের চিরস্থায়ী শান্তি ও সুখের আবাস। সেখানে থাকবে না কোনো দুঃখ, কষ্ট বা অভাব। তবে কোরআন-হাদিসের বর্ণনায় এমন একটি বিষয় উঠে এসেছে, যা জান্নাতবাসীর মনে আফসোস তৈরি করতে পারে। তা হলো দুনিয়ায় থাকাকালে আরও বেশি নেক আমল না করার আক্ষেপ।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, জান্নাতে সবার মর্যাদা এক হবে না। প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী মর্যাদা দেওয়া হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর প্রত্যেকের জন্য তাদের আমল অনুযায়ী মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ তাদের আমলের পুরো প্রতিফল দেবেন এবং তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত: ১৯)
অর্থাৎ দুনিয়ায় মানুষের নেক আমল যত বেশি হবে, আখিরাতে তার মর্যাদাও তত বেশি হবে। ফলে জান্নাতে প্রবেশের পর কেউ যখন নিজের চেয়ে উচ্চতর মর্যাদায় অন্যদের দেখতে পাবেন, তখন দুনিয়ায় আরও বেশি আমল করার সুযোগ থাকলেও তা কাজে না লাগানোর জন্য আফসোস হতে পারে।
দুনিয়াই আমল করার সুযোগ
কোরআনে দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতির সময় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে পরকালের ফসল চায়, আমি তার ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে দুনিয়ার ফসল চায়, আমি তাকে তা থেকে কিছু দিই, কিন্তু পরকালে তার কোনো অংশ নেই।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ২০)
কৃষক যেমন বীজ বপনের সময় পার হয়ে গেলে ফসল ফলাতে পারে না, তেমনি মানুষের মৃত্যুর পর আমল করার সুযোগও শেষ হয়ে যাবে। তাই জীবিত থাকতেই নেক আমল করে যেতে হবে।
কেয়ামতের দিন আফসোস করবে মানুষ
কোরআনে কেয়ামতের দিনের মানুষের গভীর অনুতাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হায় আফসোস, আল্লাহর ব্যাপারে আমি যে গাফিলতি করেছি। আর আমি তো উপহাসকারীদের একজন ছিলাম।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৬)
এখানে ‘হাসরাহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ গভীর অনুতাপ বা এমন আফসোস, যা আর দূর করার কোনো সুযোগ থাকবে না। দুনিয়ায় আল্লাহর আনুগত্য থেকে গাফেল থাকা এবং নেক আমলকারীদের নিয়ে উপহাস করার পরিণতিতে মানুষ সেদিন অনুতপ্ত হবে।
মৃত্যুর সময় ফিরে আসতে চাইবে মানুষ
মৃত্যুর সময় মানুষ আবার দুনিয়ায় ফিরে গিয়ে নেক আমল করার সুযোগ চাইবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে, সে বলে, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে আবার দুনিয়াতে পাঠান। যেন আমি দুনিয়াতে যে সৎকাজ ছেড়ে এসেছি, তা করতে পারি।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৯৯-১০০)
কিন্তু তখন আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না। তাই মৃত্যুর আগেই নেক আমলের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তওবা করে ফিরে আসার সুযোগ এখনো আছে
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরে এসো এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো, শাস্তি আসার আগেই। এরপর আর তোমাদের সাহায্য করা হবে না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৪)
মানুষ ভুল করতেই পারে। তবে ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ জীবিত থাকা পর্যন্ত রয়েছে। তওবা, ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু মৃত্যু এসে গেলে এই সুযোগ আর থাকবে না।
দোজখবাসীরাও ফিরে আসতে চাইবে
কোরআনে দোজখবাসীদের আকুতির কথাও এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা সেখানে চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের বের করে দিন। আমরা আগে যা করতাম, তার পরিবর্তে সৎকাজ করব।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৭)
কিন্তু তখন তাদের সেই আবেদন গ্রহণ করা হবে না। কারণ আমল করার সময় ও সুযোগ দুনিয়াতেই দেওয়া হয়েছিল।
পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে সময় ও সুযোগের মূল্য বোঝাতে পাঁচটি বিষয়কে অন্য পাঁচটি বিষয়ের আগে গুরুত্ব দিতে বলেছেন। তিনি বলেন,
‘বার্ধক্যের আগে যৌবনকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে গনিমত মনে করো।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৮৪৬)
এই হাদিসে মানুষের জীবনের সীমিত সুযোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। যৌবন, সুস্থতা, সামর্থ্য, অবসর ও জীবন—সবই একসময় শেষ হয়ে যায়। তাই সুযোগ থাকতেই নেক আমল করা জরুরি।
এখনই প্রস্তুতির সময়
জান্নাতে গিয়ে দুনিয়ার জীবনের সময় নিয়ে আফসোস করতে না চাইলে এখন থেকেই আমলের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বেশি নামাজ পড়া, দোয়া করা, দান-সদকা করা, কোরআন তিলাওয়াত এবং নিয়মিত আল্লাহর জিকির এসব নেক আমল আখিরাতের জন্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে।
একটি বর্ণনায় এসেছে, জান্নাতবাসীরা দুনিয়ায় আল্লাহর জিকির ছাড়া যে সময় কাটিয়েছিল, সে সময়ের জন্য আফসোস করবে। (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ১৮২; বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৫১২)
তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করে নেক আমলে ব্যয় করাই মুমিনের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ দুনিয়ায় চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসবে না; আর আখিরাতে নতুন করে আমল করার সুযোগও থাকবে না।

