জ্বালানি তেল আমদানি বেসরকারি খাতে ছাড়ার উদ্যোগ স্থগিত চায় জামায়াত

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২১:৪৩

জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সরকারের এ উদ্যোগ কোনো সংস্কার নয়, বরং ‘হস্তান্তর’ এর ফলে জ্বালানি খাতে বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে অভিযোগ দলটির।

শনিবার (৮ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

এসময় তিনি বলেন, ‘আমরা ঢালাওভাবে বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করছি না। তবে কোনো খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে যদি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, সরকারের উচ্চপর্যায়ে লুটপাট, ভাগাভাগি বা কোনো সিন্ডিকেটের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়, তাহলে এর প্রতিবাদ না করে আমাদের উপায় নেই।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রত্যেক মানুষকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে।’

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার পর জ্বালানি খাতকে বেসরকারি কোনো শিল্প গ্রুপের হাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ আরও একধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’

জামায়াতের দাবি, বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিপণনের সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়ার পরিবর্তে কয়েকটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও শত শত কোটি ডলারের ব্যাংক লাইনের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এই সক্ষমতা আছে হাতেগোনা মাত্র ৩-৪টি শিল্পগোষ্ঠীর। জ্বালানি খাত প্রাইভেট সেক্টরের হাতে গেলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে যাবে এবং বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হবে। এর ফলে এই খাতের ওপর সংসদের কোনো জবাবদিহি থাকবে না।

দলটি আরও দাবি করে, বিপিসিকে ‘অদক্ষ’ ও ‘লোকসানি’ দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে।

এ সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-

১. পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে।
২. খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করতে হবে এবং জনসাধারণের মতামত গ্রহণের জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের সুযোগ দিতে হবে।
৩. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানির আয়োজন করতে হবে, যেখানে বিরোধী দল, ক্যাব, সিপিডি,  বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
৪. বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার করতে হবে-যার মধ্যে রয়েছে স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয়  প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলককরণ এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য উন্মুক্ত করা।
৫. ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
৬. জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম প্রমুখ।

ইত্তেফাক/এসএইচ