‘আদিবাসী-ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বিতর্ক জিইয়ে রাখছে কারা? 

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:৪৯

তারা ‘আদিবাসী’ না ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বিতর্কটার নিষ্পত্তি হবে না? ফয়সালাহীনই থেকে যাবে? মানে চলতেই থাকবে? বাংলাদেশ সরকারের নীতি, রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ও সংবিধান অনুযায়ী দেশের পাহাড়ি ও সমতলের ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের পরিচয় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গণমাধ্যমে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গবেষক ও অধিকারকর্মীদের কারো কারো দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা বলতে চান, এটি জাতিসংঘের সংজ্ঞার পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক আদিবাসী সনদের সঙ্গেও যায় না। এর ফাঁকে একটা গোষ্ঠী বারবার তাদের প্রয়োজনমতো শব্দ ব্যবহার করে নানা সুবিধা হাতাচ্ছে। মাঝেমধ্যে সুযোগ বুঝে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দিকে আঙুলও তোলে। 

তথ্যের প্রয়োজনে বলতে হয় শান্তিচুক্তিতে উলে­খ ছিল ‘উপজাতি’। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ১ নম্বর ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল বলা হয়েছে। চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ১ নম্বর ধারায় পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকবে বলে উলে­খ করা হয়েছে। এরকমভাবে পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে মোট ১৭ বার উপজাতি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘উপজাতি’ হিসেবে শান্তিচুক্তিতে উপজাতীয়দের সংগঠন পিসিজেএসএস সইও করেছে। তার পরও তাদের নেতাদের মধ্যে সময়ে সময়ে ‘আদিবাসী’ ইস্যুতে খোলা গরম করার প্রবণতা রয়েছে। 

এখানে যে সূ² বিষয়টি লুকিয়ে আছে, তা হলো এটি দেশের অখণ্ডতার ওপর হুমকি। কারণ ‘আইএলও কনভেনশন-১৬৯’ ও ‘জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র-২০০৭’-এ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ‘আদিবাসী’ নাগরিকদের নিজস্ব এলাকা/অঞ্চলে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর অধিকার, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর সামরিক কার্যক্রম বন্ধের অধিকারসহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর অধিকারের কথা বলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেওয়া হলে দেশের মধ্যে ‘আদি’ দেশ বয়ান তৈরি করা যাবে। তৈরি হবে ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসন অর্জনের চিকন পথ। সেই উদ্দেশ্য হাছিলের টার্গেটেই মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় নেতারা ও মহল বিশেষ ‘আদিবাসী’ টাটকা রাখার কাজে যারপরনাই তৎপর। দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংখ্যা ১৭ লাখের মতো। যা সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ১ শতাংশ। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধিকাংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে বসবাস করে। এদের মধ্যে রয়েছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খেয়াং, চাক, খুমি, কুকি, বম, লুসাই, পাংখোয়া, সাঁওতাল, মণিপুরি, ওরাঁও, মুন্ডা, টিপরা, হাজং, খাসিয়া, মং, মুরং, রাজবংশী, কোচ, হদি, পাহাড়ি, মালপাহাড়ি, ভূমিজ, কোল ইত্যাদি। চট্টগ্রাম থেকে পার্বত্যাঞ্চলকে (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা) আলাদা করলে এই অঞ্চলের প্রমাণযোগ্য প্রাচীন ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ মেলে না।

সুপ্রাচীনকাল থেকে উত্তরে ত্রিপুরা এবং দক্ষিণ-পূর্বে আরাকান রাজ্যের মধ্যবর্তী চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা জনপদে বাঙালিদের প্রাধান্য থাকলেও সীমান্তবর্তী গভীর অরণ্যবেষ্টিত অরক্ষিত অঞ্চলে পার্শ্ববর্তী এলাকা-ত্রিপুরা, মিজোরাম, আরাকান ও বার্মা থেকে পাহাড়ি যাযাবর শ্রেণির কিছু গোত্র খাদ্যের সন্ধানে প্রায়ই আসত। আবার বেরিয়ে যেত। এদের মধ্যে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে কুকি জাতিগোষ্ঠীর পাংথুয়া, লুসাই ও উত্তর দিকের ত্রিপুরা অঞ্চল থেকে রিয়াং, উসুই ও ত্রিপুরাগণ উক্ত অঞ্চলে আসে। দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বার্মা এবং আরাকান থেকে আসে ম্রো, চাক, খুমি, খোয়াং, বম, তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের লোকজন। তবে বর্তমানে যেসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পার্বত্যাঞ্চলে বসবাস করছে তাদের কেউই সপ্তদশ শতকের পূর্বে এ এলাকায় এসেছে বলে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত ‘রাজমালা’ গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, ত্রিপুরার মহারাজা রত্ন ফা ওরফে রত্নমাণিক্য (১২৭৯-১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ) এর আমলে পার্বত্যঞ্চলে বাঙালিদের অস্তিত্ব ছিল। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলা তথা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৮১৫ জন। এর মধ্যে বাঙালি ৯ লাখ ২২ হাজার ৫৯৮ (৫০.০৬ শতাংশ) জন এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি ৯ লাখ ২০ হাজার ২১৭ (৪৯.৯৪ শতাংশ) জন। তাদের মধ্যে চাকমারা ষোড়শ শতাব্দী থেকে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে। চাকমা উপজাতি মূলত আরাকান রাজ্যের দৈংনাক সম্প্রদায়ের অংশ। একইভাবে মারমা উপজাতি ১৭৮৮ সালে আরাকান রাজ্যে বর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এ অঞ্চলে পালিয়ে এসে বসতি গড়ে তুলেছে। 

নৃ-তাত্ত্বিক এবং জাতিতাত্ত্বিক গবেষণায় স্পষ্ট, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী কোনো জনগোষ্ঠীই এখানকার মূল আদিবাসী দাবিদার হতে পারে না। এখানকার বাঙালিরা যেমন সমতা থেকে আগমন করেছে তেমনি উপজাতিরা এসেছে ত্রিপুরা, আরাকানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে। কোনো জাতি বা গোষ্ঠী জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোন নামে পরিচিতি লাভ করবে তা সাব্যস্ত হয় ঐ জাতির ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর। কোনো জাতি হতে পারে বঞ্চিত, দরিদ্র, পশ্চাৎপদ, অনুন্নত কিংবা অনগ্রসর। কিন্তু এগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোনো একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে বিশেষ নামে ভূষিত করা যায় না। আর আদিবাসী তো আরও ভিন্ন কিছু। সেখানে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী বেশি মানানসই। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে তাদের জন্য সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কোটা সুবিধা রয়েছে। তাদের একটি অংশ একদিকে এসব সুবিধাভোগী, আবার প্রতিবছর ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনও করে। রীতিমতো দ্বিচারিতা। বুঝেশুনেই কাজটি করছে তারা। তাদের দিয়ে করানোও হচ্ছে। 

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে ‘আদিবাসীদের অধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র’ উত্থাপন করা হয়। ঘোষণাপত্রটি প্রকাশের পর হতেই কিছু সুবিধাবাদী উপজাতি নিজেদেরকে অযাচিতভাবে আদিবাসী হিসেবে দাবিনামায় নামে। প্রাথমিক পর্যায়ে উপজাতীয় নেতাদের অনেকে এ আদিবাসী স্বীকৃতি দাবির বিপক্ষে ছিলেন। এমনকি জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সভাপতি সন্তু লারমাও প্রাথমিক পর্যায়ে এই দাবির বিপক্ষে অবস্থান নেন। পরে আবার অবস্থান বদলে ফেলেন। এই ঘোষণাপত্রটি বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক সুবিধাসংবলিত একটি আইনি কাঠামো। জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ-৪-এ আছে : ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আÍনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন ও স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে এবং তাদের স্বশাসনের কার্যাবলির জন্য অর্থায়নের পন্থার ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার রয়েছে।’ আবার অনুচ্ছেদ-৩৬-এ আছে, ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর, বিশেষত যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে, তাদের অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কার্যক্রমসহ যোগাযোগ সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।’ ঘোষণাপত্রের এসব নির্দেশ দেশ-সরকার, এমন কি ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য ভয়াবহ।

যে কারণে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের ওপর ভোট গ্রহণের সময় বাংলাদেশ বুঝেশুনেই ভোটদানে বিরত থেকেছে। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী না থাকার কারণেই বাংলাদেশ ভোট দানে বিরত থাকে। বাংলাদেশ সরকার পত্রের মাধ্যমে জাতিসংঘকে আদিবাসী বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান ব্যাখ্যা করে। পত্রে বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিষ্কার করে বলে, ‘দেশটিতে কিছু উপজাতি জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই।’ বাংলাদেশের সঙ্গে ভোটদানে বিরত ছিল রাশিয়া, ভুটান, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ইউক্রেন, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশ। অনুপস্থিত ছিল অনেক উন্নত দেশ। উল্লেখ্য, ভারতে বসবাসকারী একই সম্প্রদায়ভুক্ত উপজাতিদের সেখানকার সংবিধানে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়নি। সেখানে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামকে উপজাতি অধ্যুষিত রাষ্ট্র হিসেবে উলে­খ করা হয়েছে। 

তাদের কেউ কেউ তো আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি- কোনোটাতেই পড়তে চায় না। তারা হতে চায় বাংলাদেশি। হতে চায় মূলধারা। পাহাড়ে কারা আদিবাসী এ বিতর্কেও যেতে চায় না। কারণ সেখানেও অনেক ফের। বম, চাকমা, ত্রিপুরা কে বেশি আদি, বা কে এ ভূভাগে আগে এসেছে- সেই বিতর্কে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে নারাজ তারা। সেই বিবেচনায় তারা যথেষ্ট বুঝদার। সচেতন যে কেউই জানেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কোন অধিবাসী আগে বা পরে এসেছে, সেটার ভিত্তিতে বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্তকারী শব্দ যেমন, কাউকে ‘আদিবাসী’ কিংবা কাউকে ‘বহিরাগত’ আখ্যায়িত করা জাতীয় ঐক্য ও সংহতির নিরিখে অযৌক্তিক। অত্যন্ত আপত্তিকর ও বিপজ্জনকও। 

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন