১১ দলীয় জোটে আসন বণ্টন নিয়ে চরমোনাইয়ের সঙ্গে বিরোধ, ৮০ আসনের দাবিতে বৈঠক ছাড়ার ঘটনা এবং পরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে চরমোনাইপন্থীদের গালিগালাজ—এসবের বিস্তারিত তুলে ধরে চরমোনাইয়ের রাজনৈতিক আচরণের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিশের সাবেক সভাপতি মোল্লা খালিদ সাইফুল্লাহ।
এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, ১১ দলীয় ঐক্যের শুরুতে চরমোনাইয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে জোটে আনতে তাদের আমিরের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জোটে যোগ দেওয়ার পর আসন বণ্টনের সময় চরমোনাই জামায়াতের সঙ্গে অধিকাংশ আসন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত চরমোনাই ৮০টি আসন না পেলে জোটে থাকবে না বলে অবস্থান নেয়।
খালিদ সাইফুল্লাহর ভাষ্য, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রথম দিকে কোনো জোটে না গিয়ে দলীয় কার্যক্রম শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী ছিল। এ কারণে বিএনপির দিকে না যাওয়ায় বিএনপির কেউ কেউ দলটিকে ‘জামায়াতের দালাল’ এবং জামায়াতের দিকে না যাওয়ায় চরমোনাইপন্থীরা ‘বিএনপির দালাল’ বলে গালিগালাজ করত।
পরে দলীয় শূরার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১১ দলীয় জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। খালিদ সাইফুল্লাহ দাবি করেন, এর আগে চরমোনাইয়ের অনেক নেতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের আমিরকে জোটে আসার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। এমনকি নায়েবে আমির রহমানিয়া মাদরাসায় গিয়ে আমিরে মজলিসের ‘হাত-পা ধরার মতো’ অবস্থায় পৌঁছেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জোটে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় আসন বণ্টনের আলোচনা। খালিদ সাইফুল্লাহর অভিযোগ, চরমোনাইয়ের পরিকল্পনা ছিল জামায়াত ও চরমোনাই নিজেদের মধ্যে অধিকাংশ আসন ভাগ করে নেবে এবং অন্য দলগুলোকে অল্পসংখ্যক আসন দেবে। এ সময় বিভিন্ন জায়গায় ‘হাতপাখা-দাঁড়িপাল্লা’, ‘জামাত-চরমোনাই’ স্লোগানও দেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় একটি বৈঠকে চরমোনাইয়ের একজন শীর্ষ নেতা অন্য দলগুলোকে তুচ্ছ করে বলেন, জামায়াত বড় দল হিসেবে ১৫০টি আসন নেবে এবং চরমোনাই নেবে ১২০টি। অর্থাৎ জামায়াত-চরমোনাই মিলে ২৭০টি আসন এবং অন্য দলগুলোর জন্য থাকবে ৩০টি আসন। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টি এবং বাকি দলগুলোকে ১৫টি আসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
খালিদ সাইফুল্লাহর ভাষায়, ‘এটা ছিল অহংকারের চূড়ান্ত সীমা।’
অন্যদিকে জামায়াত সারা দেশে কয়েক দফা জরিপ করে চরমোনাইকে কোনোভাবেই ৫০টির বেশি আসন দেওয়া যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানান তিনি। জোটে আলোচনার ভিত্তি ছিল, যে আসনে যে দলের প্রার্থী তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেই দলের প্রার্থীকে ওই আসন দেওয়া হবে। এই হিসাবেই চরমোনাই প্রায় ৩০টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তার চেয়েও কম আসন পায় বলে দাবি করেন তিনি।
খালিদ সাইফুল্লাহ স্বীকার করেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্য জোটের কোনো দলেরই যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না। তার ভাষ্য, জামায়াত ৫০টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি হচ্ছিল না। জামায়াতের বক্তব্য ছিল, তারা যে আসনগুলো ছাড়বে, সেগুলো অন্য দলগুলোর প্রার্থীরা জিততে পারবেন না। এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দর-কষাকষি ও মন-কষাকষি চলতে থাকে।
একপর্যায়ে জামায়াত ১৪ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করে ঐক্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। চরমোনাই না এলে তাদের ছাড়াই ঐক্য ঘোষণা করার পরিকল্পনা ছিল বলে জানান খালিদ সাইফুল্লাহ। তবে মামুনুল হক এতে আপত্তি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেন।
এরপর রাতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কার্যালয়ে বৈঠক ডাকেন মামুনুল হক। দীর্ঘ আলোচনার পর চরমোনাইয়ের পীর সাহেব ‘৮০ সিট হলে আছি, নতুবা নাই’—এমন অবস্থান নিয়ে বৈঠক ছেড়ে যান বলে দাবি করেন খালিদ সাইফুল্লাহ।
তিনি বলেন, ওই বৈঠকে বিভিন্ন দলের নেতারা কান্নাকাটি করে চরমোনাইয়ের পীরকে ৫০ আসনে রাজি হয়ে ঐক্য ধরে রাখার অনুরোধ করেন। কিন্তু চরমোনাইয়ের পক্ষ থেকে ৮০ আসনের দাবি থেকে সরে আসা হয়নি। পরে অন্য নেতারা বুঝতে পারেন, চরমোনাইকে সঙ্গে রেখে আর ঐক্য করা সম্ভব নয়। ফলে তাদের ছাড়াই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে এরপরও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মধ্যে অন্য একটি আশঙ্কা তৈরি হয় বলে জানান খালিদ সাইফুল্লাহ। চরমোনাই জোট ছাড়লে তাদের সমর্থকেরা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারেন—কেন তারাও বের হয়ে গেল না। এ কারণে আমিরে মজলিস চরমোনাইয়ের কার্যালয়ে গিয়ে নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন।
সেখানে মামুনুল হক বলেন, তারা চরমোনাইয়ের সঙ্গে একসঙ্গে ছিলেন এবং ফয়জুল করিম তাকে জোটে আসার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন। অনেক পরে তারা জোটে এসেছেন। এখন চরমোনাই বের হয়ে গেলেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে বের হওয়া সম্ভব নয়। তবে দুই পক্ষের মধ্যে যেন কোনো সম্পর্ক নষ্ট না হয়, সেই অনুরোধও করেন তিনি।
খালিদ সাইফুল্লাহর দাবি, চরমোনাইয়ের নেতারা তখন জানিয়েছিলেন, মামুনুল হকের সঙ্গে তাদের কোনো শত্রুতা নেই এবং সম্পর্ক ভালো থাকবে। কিন্তু পরে চরমোনাইয়ের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আচরণে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়।
তার অভিযোগ, চরমোনাইপন্থীরা মামুনুল হককে নিয়ে ‘জামাতের দালাল’, ‘বউ জামাত করে’, ‘জামাতের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা খেয়েছে, এজন্য বের হতে পারছে না’, ‘জামাত থেকে বের হলে সব ফাঁস হয়ে যাবে’ এবং ‘আমেরিকার দালাল’—এ ধরনের নানা অভিযোগ ও গালিগালাজ করেছেন।
খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, মামুনুল হক চরমোনাইয়ের বিরুদ্ধে কিছু না বললেও তাকে লক্ষ্য করে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। তার মতে, ‘গালাগালি মানুষ তখনই করে, যখন যুক্তি হারিয়ে যায়।’
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিশের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘ওদের সঙ্গে আপনি জীবনে ঐক্য করে চলতে পারবেন না।’
তিনি দাবি করেন, তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকাকালে সারা দেশের খবর তার কাছে ছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে চরমোনাইপন্থীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যে ধরনের আচরণ পেয়েছে, সে বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
চরমোনাইয়ের কিছু নেতার প্রশংসাও করেন খালিদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ওদের মধ্যে কিছু নেতৃবৃন্দ ভালো আছেন, এটা আমি স্বীকার করি।’ তবে তার দাবি, স্বাভাবিকভাবে চরমোনাইয়ের তৃণমূল ও কর্মী গোষ্ঠী অন্য যেকোনো দলের তুলনায় বেশি কষ্ট দেবে।
পোস্টের শেষ দিকে তিনি এটিকে ‘চূড়ান্ত বাস্তবতা’ ও ‘চূড়ান্ত সত্য কথা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চরমোনাইয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতে ঐক্য করে চলা সম্ভব নয়।

