দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ চায় ঢাকা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নতুন হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে ভারত এমন প্রত্যাশা, হাদি হত্যায় জড়িত সন্দেহে আটকদেরও ফেরত দেওয়ার আহ্বান

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩১

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ভারত ত্বরান্বিত করবে এমন আশা করছে বাংলাদেশ। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০২৫ সালে নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে ঢাকা।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দফতরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে স্বাগত জানান। ভারতীয় হাইকমিশনার ঢাকায় গত দুই মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। একইসঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয় বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে। আমার কাছে সবই ইতিবাচক মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি কূটনীতিক নই। আমরা বৈঠক করেছি বলা চলে, পাবলিক ফিগারের মতো, জনপ্রতিনিধির সঙ্গে আরেক জনপ্রতিনিধির মতো। উনার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি খুবই আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম দেখায় আমার মনে হয়নি যে প্রথমবার আমি উনার সঙ্গে দেখা করছি। আর তিনি খুবই ভালো, খুবই হাম্বল অন দ্য গ্রাউন্ড।’

বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উই আর লুকিং ফরওয়ার্ড’। প্রধানমন্ত্রীকে সফরের জন্য আমাদের আমন্ত্রণ তো আগে থেকে আছে। আগেও উল্লেখ করেছি, ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আমরা খুবই ইতিবাচক। দুই নেতা একসঙ্গে বসলে, আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

গণতন্ত্রে সবসময়ই নানা ইস্যু থাকবে উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ইস্যু না থাকলে ওইটা ডেমোক্রেসি না। আমাদের ইস্যু থাকবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই, ভালো সম্পর্ক। ভালো সম্পর্ক হলো উইন উইন সিচুয়েশন। তিনি বলেন, আমাদের ইতিহাস তো বদলাতে পারবেন না। আমাদের নেইবারহুড তো বদলাতে পারবেন না। আমি সবসময় বলি যে, আমরা শুধু সীমান্ত শেয়ার করি না, স্বপ্নও শেয়ার করি। 

বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের জন্যই আগামী দিন ভালো যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি বলেন, আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিন ভালোই হবে। ইস্যুজটা সর্ট আউট করতেই হবে দুই দিক থেকেই। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী, উনার সঙ্গে দেখা করে খুবই ভালো লাগলো। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা হলো প্রথমবার। আমি দুই নেতার প্রতিই কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি এমন কোনও ইস্যু নেই যা আমরা বসে সমাধান করতে পারবো না। আর আমাদের মধ্যে এটা হলো- উইন উইন সিচুয়েশন। দুই  দেশের মানুষ চায় সম্পর্ক ভালো হোক। আমার প্রধানমন্ত্রীও আমাকে সবসময় এটা বলেছেন যে সম্পর্ক ভালো থাকা বিশেষ দরকার। না হলে আমি কেন আসি?

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের বৈঠকের বিষয়ে গতকাল সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বৈঠকে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে কথা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের ব্যাপারে আমাদের যে অবস্থান আমরা সেটা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি এবং সেটা গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। সেটা আমাকে গতকালকেও (রবিবার) তারা জানিয়েছেন, আজকেও তারা প্রধানমন্ত্রীকে সেটা বলেছেন।

ভারত এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছে কি-না এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা দুঃখ প্রকাশের বিষয় নয়। আপনাদেরকে ভালো করে বুঝতে হবে কি হয়েছে জিনিসটা। একটা রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে, নির্বাহী, আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগ। শেখ হাসিনার বিচার হয়েছে বাংলাদেশের আদালতে এবং ৫ আগস্ট ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে শেখ হাসিনা জুডিশিয়ারির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।

তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা, তার জায়গা হচ্ছে জুডিশিয়ারি। বাংলাদেশের একটা কম্পিটেন্ট কোর্ট তার বিচার করেছে, তাকে দণ্ড দিয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দেশে কী হয়, তাকে কাস্টডিতে নেওয়া হয় এবং তার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকে, সেটা আদালতে বলবে। ৫ তারিখে হাসিনা যেই কাজটি করেছে সেটা হচ্ছে- বাংলাদেশের জুডিশিয়ারি, রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি সে দেখিয়েছে এবং সেই কাজটি ভারত সরকার করতে দিয়েছে। বাংলাদেশের কোন স্তম্ভকে ভারত ‘আন্ডারমাইন বা ছোট করে দেখবে না’ বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুতরাং আমরা এই কথাটা গতকালকেও বলেছি যে, রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোর প্রতি আমরা চাই সারা বিশ্বের সকল দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক। আমরা আশা করবো, আমাদের এই বিষয়টি ভারত সরকার অনুধাবন করবেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমার ধারণা হচ্ছে, তারা জিনিসটা বুঝতে পেরেছে। আশা করবো যে, আমাদের রাষ্ট্রের কোন স্তম্ভকে আন্ডারমাইন করার মত তারা আর কিছু করবেন না, এটা আমাদের প্রত্যাশা এবং তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে তাতে আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত যে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। সীমান্ত হত্যা কিংবা পুশ ইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এগুলো খুব সংক্ষেপে আমরা বলেছি। এগুলো তো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার নয়, এগুলো নিয়ে আমি গতকালই তার সঙ্গে আলাপ করেছি।

ইত্তেফাক/এনএন