বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও স্বতন্ত্র পরিচয় অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার বা স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটিসি) ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (আইডব্লিউজিআইএ)।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটি বলেছে, আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশের আদিবাসীরা একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং স্বতন্ত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকায় ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় দুই মন্ত্রী এসব মন্তব্য করেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম গবেষণা ফাউন্ডেশন (সিএইচআরএফ) ওই আলোচনার আয়োজন করে।
পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সিএইচটিসি ও আইডব্লিউজিআইএ জানায়, অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই এবং সব নাগরিককে কেবল বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহারকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তির আদিবাসী পরিচয় স্বীকার করা জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি নয়। বরং পরিচয়ের স্বীকৃতি রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতার বিষয়টি তুলে ধরে সংগঠন দুটি বলেছে, বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন না করলেও ১৯৫৭ সালের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীবিষয়ক আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে। এর ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের আইনগত দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে তারা মনে করে।
তাদের দাবি, আদিবাসী পরিচয় অস্বীকার বাংলাদেশের সংবিধান, আইন ও নীতির সঙ্গেও অসংগতিপূর্ণ। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের স্বীকৃতি রয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আইন ও নীতিতেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের উল্লেখ রয়েছে।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ওই চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে আদিবাসী পরিচয় অস্বীকারের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনা ও শান্তিপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা দুর্বল হতে পারে।
এ অবস্থায় আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সময়সীমাবদ্ধ রূপরেখা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, আদিবাসীদের স্বীকৃতি বাংলাদেশের বিভাজন সৃষ্টি করবে না। বরং তাদের পরিচয় অস্বীকার, বৈষম্য ও দমনই সমাজে বিভাজন আরও বাড়াতে পারে।

