শুধু টেস্টোস্টেরন পরীক্ষায় কি লিঙ্গ নির্ধারণ সম্ভব

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০২

টেস্টোস্টেরন বলতেই পুরুষের শরীর, পেশিশক্তি, দাড়ি-গোঁফ কিংবা যৌনক্ষমতার কথাই সবার মনে আসে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। এই হরমোন শুধু পুরুষের শরীরেই তৈরি হয় না। নারীর শরীরেও স্বাভাবিকভাবেই টেস্টোস্টেরন থাকে। কিন্তু পার্থক্য হলো, সাধারণত পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরে এর মাত্রা কম থাকে।

তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা, কিছু রোগ, ওষুধ কিংবা হরমোন-সংক্রান্ত বিভিন্ন কারণে টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই রক্তে এই হরমোনের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেলেই একজন মানুষকে নারী বা পুরুষ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে খেলাধুলায় নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল।

আলোচনা বাংলাদেশের দুই অ্যাথলেট

সম্প্রতি বাংলাদেশের দুই অ্যাথলেটকে ঘিরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ও লিঙ্গসংক্রান্ত বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯ বছর বয়সী স্প্রিন্টার কবিতা এবং ২৮ বছর বয়সী থ্রোয়ার জান্নাতকে নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করা হয়।

লিঙ্গসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। পরে বোর্ড তাদের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়।

প্রতিবেদনে জান্নাতের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ১৯ দশমিক ৬৬ ন্যানোমোল/লিটার এবং কবিতার ১৬ দশমিক ৫০ ন্যানোমোল/লিটার পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়। এরপর ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ তাদের নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়ম এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে কারও জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণ-একটি বিষয় নয়।

কেন নারীর শরীরেও টেস্টোস্টেরন থাকে

টেস্টোস্টেরন মূলত একটি যৌন হরমোন, যা নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই তৈরি হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এর উৎপাদন সাধারণত বেশি হলেও নারীর শরীরেও এটি বিভিন্ন স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কাজে ভূমিকা রাখে।

প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে মোট টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অনেক ল্যাবরেটরি রেফারেন্সে প্রায় ০ দশমিক ৫২ থেকে ২ দশমিক ৪৩ ন্যানোমোল/লিটার পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। তবে রক্তে টেস্টোস্টেরনের স্বাভাবিক মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি মাত্র সংখ্যা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বয়স, পরীক্ষার পদ্ধতি, ল্যাবরেটরির রেফারেন্স রেঞ্জ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে।

ফলে কোনো নারীর টেস্টোস্টেরন তুলনামূলক বেশি হলেই তিনি পুরুষ হবেন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।

খেলাধুলায় এই হরমোন কেন গুরুত্বপূর্ণ

খেলাধুলায় বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। বয়ঃসন্ধির পর টেস্টোস্টেরন পেশি, হাড়ের গঠন, লোহিত রক্তকণিকা ও শারীরিক শক্তির ওপর প্রভাব ফেলে। গড়ে পুরুষদের শরীরে এই হরমোনের মাত্রা নারীদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে।

বয়ঃসন্ধির পর দীর্ঘ সময় বেশি টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে শরীরে যে শারীরিক পরিবর্তন তৈরি হয়, তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট খেলায় পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে দৌড়, থ্রো বা শক্তিনির্ভর ইভেন্টে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই কিছু ক্রীড়া সংস্থা নারী বিভাগে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রাকে একটি যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।

টেস্টোস্টেরনের সীমা কি লিঙ্গ নির্ধারণ করে

কোনো ক্রীড়া সংস্থা যদি নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার জন্য একটি নির্দিষ্ট টেস্টোস্টেরন সীমা নির্ধারণ করে, সেটি মূলত ক্রীড়া-যোগ্যতার নিয়ম। এই সীমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বজনীন ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ নির্ধারণের মানদণ্ড নয়।

অর্থাৎ কোনো অ্যাথলেট নির্ধারিত হরমোনের সীমা পূরণ করছেন কি না- তা দিয়ে তিনি একটি নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কিন্তু একই পরীক্ষার ফল দিয়ে তার জৈবিক লিঙ্গ সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব নয়।

শুধু রক্ত পরীক্ষায় কি লিঙ্গের পরিচয় জানা সম্ভব

একটি টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা মূলত রক্তে ওই হরমোনের পরিমাণ জানায়। মানুষের জৈবিক বৈশিষ্ট্য এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকেরা হরমোনের পাশাপাশি ব্যক্তির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, চিকিৎসার ইতিহাস, যৌন বিকাশ, ক্রোমোজোমসহ বিভিন্ন তথ্য বিবেচনা করতে পারেন। তাই শুধু একটি হরমোন পরীক্ষার ফলকে কারও জৈবিক লিঙ্গের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

বিতর্কের জায়গা

নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক পক্ষ মনে করে, বয়ঃসন্ধির পর টেস্টোস্টেরনের প্রভাব শরীরের শক্তি ও পেশির ওপর যে সুবিধা তৈরি করতে পারে, তা প্রতিযোগিতার নিয়মে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, শুধু টেস্টোস্টেরনের মাত্রা দিয়ে একজন মানুষের সম্পূর্ণ জৈবিক বৈশিষ্ট্য কিংবা ক্রীড়া সক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না। শরীরের গঠন, জিনগত বৈশিষ্ট্য, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য শারীরিক বিষয়ও পারফরম্যান্সে ভূমিকা রাখে।

এই কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে টেস্টোস্টেরন-ভিত্তিক যোগ্যতার নিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে এবং বিভিন্ন সংস্থা সময়ের সঙ্গে নিজেদের নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে।

টেস্টোস্টেরন শুধু পুরুষের হরমোন নয়, নারীর শরীরেও এটি থাকে। আবার রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেলেই কাউকে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

তবে নির্দিষ্ট ক্রীড়া নীতিমালার অধীনে নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা যাচাই করতে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হতে পারে। তাই অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে হরমোনের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করার সময় ক্রীড়া-যোগ্যতার নিয়ম এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের লিঙ্গ নির্ধারণ-এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন, হেলথ লাইন

ইত্তেফাক/জেডএইচ