সাত লক্ষণ দেখে চিনবেন অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১৯

গ্যাসের ব্যথা বলে বহু ব্যথা এড়িয়ে যাই আমরা। বিশেষ করে নারীদের পিরিয়ড জটিলতার সঙ্গে অন্যান্য সমস্যার কারণে অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা আলাদা করে চিনে ওঠা সম্ভব হয় না। হঠাৎ একদিন অ্যাপেন্ডিক্সের মারাত্মক ব্যথায় কাবু করে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়ে যায় রোগীর। বৃহদান্ত্র এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের সংযোগস্থলে বৃহদান্ত্রের সঙ্গে যুক্ত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গকে অ্যাপেন্ডিক্স বলা হয়।

অ্যাপেন্ডিক্স আমাদের শরীরের একটি অকেজো অঙ্গ। তবে বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষের প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই অঙ্গটি। অ্যাপেন্ডিক্সের এই সমস্যাটি অ্যাপেনডিসাইটিস নামে পরিচিত। যথা সময়ে অস্ত্রোপচার না করালে বা সময় মতো সমস্যা ধরা না পড়লে অ্যাপেনডিসাইটিসের কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সেই জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ‘সার্জিক্যাল এমার্জেন্সি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাই অ্যাপেনডিসাইটিসের সমস্যা কখনও অবহেলা করা উচিত নয়।

সার্জনদের মতে, অ্যাপেন্ডিসাইটিস হলো বৃহদান্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছোট থলির মতো অঙ্গ অ্যাপেন্ডিক্সে প্রদাহ হওয়া। সাধারণত অপারেশনের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়। তাই লক্ষণ দেখা দিলে ব্যথানাশক খেয়ে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নাভির চারপাশে শুরু হয়ে ডান তলপেটে ব্যথা

অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা সাধারণত প্রথমে নাভির আশপাশে শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যথা ধীরে ধীরে পেটের ডান দিকের নিচের অংশে চলে যায় এবং সেখানে তীব্র হয়ে ওঠে। এটি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি।

হাঁটা, কাশি বা নড়াচড়ায় ব্যথা বেড়ে যাওয়া

অ্যাপেন্ডিক্সে প্রদাহ হলে হাঁটা, কাশি দেওয়া, হাঁচি বা সামান্য নড়াচড়াতেও ব্যথা অনেক বেড়ে যেতে পারে। অনেক রোগী ব্যথার কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও কষ্ট অনুভব করেন।

ক্ষুধামন্দা ও বমি বমি ভাব

হঠাৎ খাবারের প্রতি অনীহা, বমি বমি ভাব বা এক-দুবার বমি হওয়া অ্যাপেন্ডিসাইটিসের সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় পেটব্যথা শুরুর পর এসব উপসর্গ দেখা দেয়।

হালকা জ্বর

প্রদাহের কারণে অনেকের শরীরে হালকা জ্বর আসে। রোগের অবস্থা জটিল হলে জ্বর আরও বেড়ে যেতে পারে এবং শরীর দুর্বল লাগতে পারে।

পেট ফুলে যাওয়া বা গ্যাসের মতো অস্বস্তি

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, গ্যাস জমার অনুভূতি বা পেট ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে শুধু গ্যাসের সমস্যা ভেবে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া

অ্যাপেন্ডিসাইটিসে কারও কারও কোষ্ঠকাঠিন্য, আবার কারও ডায়রিয়া হতে পারে। এর সঙ্গে পেটব্যথা ও জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডান তলপেটে চাপ দিলে তীব্র ব্যথা

পেটের ডান নিচের অংশে চাপ দিলে বা চাপ ছেড়ে দিলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হলে তা অ্যাপেন্ডিসাইটিসের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ থাকলে নিজে থেকে পেট চাপাচাপি না করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত।

কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?

• তীব্র পেটব্যথা কয়েক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে।
• ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকলে।
• ব্যথার সঙ্গে জ্বর, বমি বা খেতে না পারার সমস্যা হলে।
• ডান তলপেটে তীব্র ব্যথা অনুভূত হলে।
• পেট শক্ত হয়ে গেলে বা ব্যথা হঠাৎ অসহ্য হয়ে উঠলে।

অপারেশনের মাধ্যমে অ্যাপেন্ডিক্স অপসারণ ও এন্টিবায়োটিক সেবন অ্যাপেন্ডিসাইটিসের চূড়ান্ত চিকিৎসা। প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণের পর কিছু ঘরোয়া উপায়ে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা ও ফোলা কমানো যায়। ঘরোয়া প্রতিকার গুলো হচ্ছে :

১। অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘরোয়া প্রতিকার হচ্ছে মুগ ডাল । এক মুঠো মুগ ডাল এক বাটি পানিতে ভিজিয়ে সারারাত রেখে দিন। সকালে মিশ্রণটি থেকে এক টেবিল চামচ পরিমান পান করুন। কার্যকরী ফল পেতে দিনে তিন বার গ্রহণ করুন।

২। অ্যাপেন্ডিসাইটিস নিরাময়ে রসুন অনেক কার্যকরী উপাদান। এটি অ্যাপেন্ডিক্সের ফোলা কমাতে পারে।

৩। অ্যাপেন্ডিক্সে আক্রান্ত রোগির জন্য সবজি খাওয়া ভালো। ১০০ মিলিলিটার শশা ও ১০০ মিলিলিটার বিটের রসের সাথে ৩০০ মিলিলিটার গাজরের রস মিশিয়ে দিনে দুই বার পান করলে অ্যাপেন্ডিসাইটিস নিরাময়ে অত্যন্ত উপকারি।

৪। ব্যথা কমানোর জন্য একটি ভেজা কাপড় পেটে জড়িয়ে এর উপর শুষ্ক পশমী  কাপড় শক্ত করে বেধে রাখুন।  

৫। আপনার অ্যাপেন্ডিক্স সুস্থ রাখার জন্য সারাদিনে প্রচুর পানি পান করুন।

৬। আস্ত গম খাওয়া অ্যাপেন্ডিসাইটিসের জন্য কার্যকরী ঘরোয়া প্রতিকার এবং এটি হজমের জন্য ও উপকারি।

৭। অ্যাপেন্ডিসাইটিসের রোগীদের জ্বর আসলে তুলসি পাতা পানিতে সিদ্ধ করে খাওয়ান। একমুঠো তুলসি পাতার সাথে এক টেবিল চামচ আদার পেস্ট এক কাপ পানিতে মিশিয়ে চুলায় জ্বাল দিতে থাকুন যতক্ষণ না মিশ্রণটি অর্ধেক হয়ে যায়। এটি বদহজম ও গ্যাসের ও সমস্যা দূর করতে পারে। প্রতিদিন ৩-৪টি কাঁচা তুলসি পাতা চিবিয়ে খেয়ে ফেলুন তাহলে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।  

৮। পুদিনা পাতার কয়েক ফোঁটা রস পানিতে মিশিয়ে ৩-৪ ঘন্টা পর পর পান করলে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা কমে যায়।  

৯। অ্যাপেন্ডিসাইটিস নিরাময়ে লেবুর রস অনেক উপকারি। লেবুর রস ব্যথা কমাতে এবং বদহজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সাহায্য করে। একটি লেবুর রস বের করে নিয়ে এর সাথে সমপরিমাণ কাঁচা মধু মিশিয়ে নিন। দিনে কয়েকবার মিশ্রণটি পান করুন। কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত পান করুন।

১০। এক চামচ মেথি ঠান্ডা পানিতে মিশিয়ে নিয়ে মিশ্রণটি কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিন। তারপর মিশ্রণটি ঠান্ডা করে চায়ের মত পান করুন। এটি অ্যাপেন্ডিক্সের ভিতরে পুঁজ ও অত্যধিক মিউকাস উৎপাদনে বাঁধা প্রদান করে। তাই নিয়মিত এটি পান করুন।

১১। দীর্ঘস্থায়ী অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর ক্ষেত্রে প্রতিদিন এক লিটার ঘোল পান করলে উপকৃত হবেন। এটি অ্যাপেন্ডিক্সের ভিতরে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে।

অনেক সময় শিশু বা বেশি বয়স্করা ব্যথার সঠিক বর্ণনাও দিতে পারে না। কিন্তু জটিলতা এড়াতে পেটে ব্যথা তীব্র ও স্থায়ী অথবা থেকে থেকে হলে রোগীকে শক্ত খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন বা মুখে খাবার দেওয়া বন্ধ রাখুন এবং দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।

 

ইত্তেফাক/এনটিএম