বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল নামটি মনে হলেই চোখে ভাসবে সারি সারি সবুজ চা-বাগান। পাহার টিলায় ঢেউ খেলানো সবুজ গালিচা বিছানো প্রান্তর। সেই প্রান্তরে পাহাড় টিলার মাঝ খান দিয়ে সর্পিল গতিতে বেয়ে গেছে পিচঢালা পথ। এসব পথে নানা প্রকারের যানবাহন পর্যটকদের নিয়ে ছুটছে দিন রাত—এ যেন এক নয়ন কাড়া দৃশ্য। বলতে গেলে গোটা শ্রীমঙ্গলই চা-বাগানে সুশোভিত।
সন্ধ্যায় ছোট শ্রীমঙ্গল শহর এবং চা-বিক্রয়ের দোকানগুলো বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে উঠে। হরেক রকমের চায়ের প্যাকেটগুলো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। তবে এই চা চিনতে না পারলে অর্থ ও শখ দুটাই গচ্চা যাবে। বলছিলাম এই অঞ্চলের চা-শিল্পের প্রায় ১৭০ বছরের পুরোনো শিল্পটির কথা। ১৮৪০ সালে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রাম ক্লাবের কাছে পরীক্ষামূলকভাবে চা গাছ লাগানো হয়। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনী ছাড়ায় চা-বাগান সৃজন হয়। ১৮৫৭ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চা-উৎপাদন শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় চা গাছ সম্প্রসারণ করা হয়। চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজার জেলা। এ জেলায় দেশের ৯২টি চা-বাগান রয়েছে। এছাড়া সিলেটে ২২টি ও হবিগঞ্জে ২টি চা-বাগান রয়েছে। বাগানগুলো দেখতে মনোহর। কিন্তু এর ভিতরের সংকট জানা নেই অনেকের। নীরবে ধুঁকছে সবুজ বাগানগুলো।
নানা সংকটে চা শিল্প: যথেষ্ট সম্ভাবনাময় থাকলেও সঠিক পরিচর্যা ও নীতিনির্ধারণসহ নানা সংকটে ধুঁকছে দেশের চা-শিল্প। বিশেষ করে বাগান মালিকদের সঙ্গে চা-শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে প্রায় বনিবনা হয় না। কর্মবিরতিসহ নানা আন্দোলনে চা উৎপাদন ব্যাহত হয়। এদিকে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে বাড়ানো ৯.৩৭ টাকা মজুরি বৃদ্ধি প্রত্যাখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট গেজেট বাতিলের দাবি জানিয়েছে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। একই সঙ্গে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত শুক্রবার মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া চা-বাগানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা। সীমান্তবর্তী মুরইছড়া চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ও চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সদস্য জয়কৃষ্ণের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ, সমন্বয়ক মনিষা ওয়াহিদ, চা-শ্রমিক নেতা ভাগ্য, রাজু উরাং। তারা বলেন, চা-শ্রমিকরা স্বাধীনতার ৫৫ বছর এবং এ ভূখণ্ডে ১৮৫ বছর ধরে বসবাস করার পরও তারা ভূমিহীন ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বর্তমানে তাদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৯৬ দশমিক ৩৭ টাকা করা হয়েছে, যা উচ্চমূল্যের বাজারে চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত অমানবিক। তারা ন্যূনতম মজুরি ৫০০ টাকা করার জোর দাবি জানান তারা। সংশ্লিষ্টরা বলেন, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে নিলাম মূল্যেও সামঞ্জস্য নেই বলে চা তার ইস্পিত মূল্য পাচ্ছে না। ‘অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, বিপরীতে কমেছে চায়ের দাম। আয়ের বিপরীতে ব্যয় ৮০ শতাংশ বাড়ায় চরম সংকটে চা-শিল্প,’ বলেন চা-সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ঘন ঘন আন্দোলন ও লোডশেডিংয়ের কারণে বেকায়দায় মালিকপক্ষ। এই অবস্থা চলতে থাকলে চা-শিল্পের বিপর্যয় অনিবার্য।
উৎপাদন গত বছরের চেয়ে বেশি: বাংলাদেশ টি বোর্ডের পরিচালক (পিডিউ) ড. রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘সব কটি বাগানের অবস্থা বর্তমানে অনেক ভালো। সুষম আবহাওয়া ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবার গত বছরের চেয়ে উৎপাদন ২৫-৩০ ভাগ বেশি। তিনি বলেন, এ বছর চা-এর উৎপাদন লক্ষ্য মাত্রা ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। সব ঠিক থাকলে এবার উৎপাদন লক্ষ্য মাত্র অর্জিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘চা-এর গুণমান ও উৎপাদন বৃদ্ধিসহ চা- শিল্পের উন্নয়নে আমরা পরিকল্পনা মতো কাজ করে যাচ্ছি। সংশ্লিষ্টদের জন্য নিয়মিত কর্মশালাসহ বিভিন্ন প্রোগ্রাম অনুষ্টিত হয়। বোর্ড এ শিল্পের প্রসারে যথেষ্ট আন্তরিক।’ এক প্রশ্নের জবাবে ড. রফিক বলেন, সরকার-নির্ধারিত প্রতি কেজি চা-এর নিলাম মূল্য ২৪৫ টাকা। তবে সেটি ২৪৫ টাকায় উঠেছে। গত মাসে চা-এর নিলাম মূল্য প্রতি কেজি ৩০০ টাকা উঠে। তবে ব্যবসায়ীরা বলেন, ভ্যাট, ট্যাক্স দিতে হয় আরও ২০ ভাগ। এতে তাদের পোষায় না। ব্যবসায়ীরা বলেন, নিলাম মূল্য, শ্রমিক মজুরি বাড়াতে হবে। মালিকদেরও লাভবান হতে হবে—এই তিনের সমন্বয়ে চা-শিল্পের উন্নয়ন ঘটবে।
সংকট কাটাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার ফান্ড গঠনের প্রস্তাব: দেশের চা-শিল্পের আর্থিক সংকট কাটাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে টাস্কফোর্স। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পুনর্গঠন, চা পুনঃরোপণের জন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ এবং কারখানা আধুনিকায়নের জন্য সাত বছর মেয়াদি অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে।
যে কারণে চা-শিল্প সংকটে : বহু বছরের লোকসান, উচ্চ সুদে ঋণ, রপ্তানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কম উৎপাদনশীলতার কারণে বাংলাদেশের চা-শিল্প সংকটে রয়েছে। ২০০২ সালের পর থেকে চা রপ্তানি ৭৯ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে গত এক দশকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু নিলামমূল্য সেই হারে বাড়েনি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরই উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে চা বিক্রি হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয় ২৬০ টাকা, বিপরীতে নিলামে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ দশমিক ৮৮ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে ৫১ দশমিক ১২ টাকার ঘাটতি হয়। তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। দেশে ১৭২টি চা বাগানে ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এ খাতে সরাসরি ১ লাখ ২ হাজার স্থায়ী ও ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন।
টাস্কফোর্সের সুপারিশ: চা বাগানকে কৃষি খাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা:
চলতি বছরের জুনের প্রথমার্ধে ন্যাশনাল টি কোম্পানি লি:-এর চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স চা বাগানকে কৃষি খাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করার সুপারিশ করেছে। এতে বর্তমান ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। যদি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এ শিল্প। সূত্র জানায়, উৎপাদিত চায়ের রপ্তানি এখনো দুর্বল। এ থেকে বছরে আয় হয় মাত্র ২৫- ৪৫ লাখ ডলার। আর পাকিস্তানই একমাত্র উল্লেখযোগ্য রপ্তানি বাজার। এ ছাড়া বাংলাদেশের কোনো জাতীয় চা ব্রান্ড, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি কিংবা প্রিমিয়াম রপ্তানি বাজারে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই। প্রতি হেক্টরে বাংলাদেশে চা উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কেজি। যেখানে ভারতে ২ হাজার ৫০০ কেজি এবং শ্রীলঙ্কায় ৩ হাজার ৩০০ কেজি। চা বাগানের মোট জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে চা উৎপাদন হয় না। তবে এর মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ জমি নতুন চা চাষের জন্য ব্যবহারযোগ্য। বাকি জমি পরিচালনাগত, আবাসিক ও পরিবেশগত কারণে।
বিটিআরআইয়ের জন্য পৃথক বার্ষিক বাজেট: এ ছাড়া বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি) এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) জন্য পৃথক বার্ষিক বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে তিন স্তরের ন্যূনতম মূল্য কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় মানের চায়ের জন্য প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা, রপ্তানিযোগ্য চায়ের জন্য প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং প্রতি কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধা। প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত চায়ের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি বাগানের জন্য ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা : এ ছাড়া একটি জাতীয় চা পুনঃরোপণ মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি বাগানকে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতি বছর ২ থেকে ৩ শতাংশ চা-গাছ প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। রপ্তানি পুনরুজ্জীবিত করতে পাকিস্তান, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি প্রণোদনা ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চা-শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা, একটি টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক গঠন এবং কৃষি প্রযুক্তি, সৌর অবকাঠামো ও প্রিমিয়াম ব্রান্ডে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
টি গ্রিন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি গঠনেরও সুপারিশ: সৌর অ্যাগ্রিভোল্টাইক, ব্যাটারি জ্বালানি সংরক্ষণ, সেচ এবং কারখানা আধুনিকায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ‘ টি গ্রিন ফাইন্যান্স ফ্যাসিলিটি’ গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র চা-চাষিদের সহায়তায় উত্তরবঙ্গের ৮ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র চাষিকে কারিগরি সহায়তা ও মানোন্নয়ন সেবা দিতে পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি স্থায়ী আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিবেদনে শ্রমিক কল্যাণের ন্যূনতম মানদণ্ডও প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য সরকার পরিচালিত স্কুল, কার্যকর ডিসপেনসারি, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা এবং বাগানের সড়ক উন্নয়ন। সংস্কার বাস্তবায়ন শুরু করতে টাস্কফোর্স ৯০ দিনের একটি পরিকল্পনাও রয়েছে।
৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর সুপারিশ: প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য যাচাই এবং আর্থিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। ৬০ দিনের মধ্যে চা বাগানকে কৃষি খাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা, ভ্যাট ও টি সেস সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর কথা বলা হয়েছে। ৯০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করা, বিডায় টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক চালু করা, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু করা এবং পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
আয় না বাড়লে কল্যাণ সম্ভব নয়: চা-শিল্প টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক মামুন রশীদ বলেন, নতুন চারা রোপণ এবং সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। চা কোম্পানিগুলোর আয় না বাড়লে শ্রমিকদের কল্যাণ করা সম্ভব নয়।

