আল জাজিরার বিশ্লেষণ

হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের, বাস্তবে কি সম্ভব?

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৯

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরাজিত করার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায় না। ফলে ট্রাম্পের এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

গত শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সেখানে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।

তবে ইরান ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, কোনো বক্তব্য, আদেশ কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা সম্ভব নয়।

হরমুজ প্রণালি

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে। প্রণালিটি কখন খোলা বা বন্ধ থাকবে, সে সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে বলে দাবি করেন তিনি।

হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যেও আলোচনা চলছে। প্রণালিটির অপর উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দুই দেশের আলোচনা শিগগির শেষ হতে পারে।

তবে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে গত জুনে করা সমঝোতা স্মারকের শর্ত মানতে হবে। এর মধ্যে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয় রয়েছে।

অর্থাৎ, ইরানের বর্তমান অবস্থান হলো হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট কিছু ছাড় দিতে হবে।

হরমুজ প্রণালিতে নোঙর করে আছে জাহাজ, পাশেই সাগরে সাঁতার কাটছে শিশুরা

ট্রাম্প কি হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড করতে পারবেন?

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে শুধু প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণা যথেষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, দেশটির সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট এককভাবে কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন না। এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য সিনেটের অনুমোদিত চুক্তি অথবা কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন।

লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই ও পানামা খালের অধিগ্রহণ এবং স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর পুয়ের্তো রিকো ও ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়েছিল।

ফেইন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি দখল বা নিজেদের ভূখণ্ড করার চেষ্টা করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নাটালি ক্লেইনের মতে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশটিকে সেখানে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য ইরান বা অন্তত দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি আসলে কার?

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক সার্বভৌমত্ব নেই। প্রণালিটির দুই পাশে রয়েছে ইরান ও ওমান।

জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, উপকূলীয় দেশগুলো উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌম অধিকার রাখে। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নির্দিষ্ট অধিকারও রয়েছে।

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার। ফলে ইরান ও ওমানের ১২ নটিক্যাল মাইল করে আঞ্চলিক জলসীমা সেখানে একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়নি। তবে প্রণালি ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচলসংক্রান্ত এর অনেক নিয়ম আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

যুক্তরাষ্ট্রেও যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ রয়েছে। রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে দেশটির অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে জ্বালানির বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের বেশি হয়েছে। বিষয়টি মার্কিন নাগরিকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহে বলেছেন, যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার এখন পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটি দ্বিতীয় অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।

কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি বড় অংশ তার রাজনৈতিক সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া। তিনি বলেন, ট্রাম্প একজন ‘শোম্যান’ হিসেবে পরিচিত এবং তার অনেক বক্তব্য আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বানানোর বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে বাস্তবসম্মত মনে করেন না মাসগ্রেভ। তার মতে, আইনগত ও বাস্তব দুই দিক থেকেই এমন পদক্ষেপ কার্যত অসম্ভব। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে এটাও স্পষ্ট যে, দীর্ঘ সংঘাতের পর ইরানের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে এখনই পিছু হটার অবস্থানে নেই যুক্তরাষ্ট্র।

ইত্তেফাক/এসজে