বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের আলোচনা নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠন, দ্রুত পরিবর্তনশীল অপরাধ মোকাবিলা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক বিকাশের বিভিন্ন ধাপ শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন, জনসংখ্যা, নগরায়ণ, প্রযুক্তি এবং নাগরিকের প্রত্যাশা পরিবর্তিত হয়েছে; ফলে পুলিশের কাঠামো ও কর্মপদ্ধতিকেও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারও সেই ধারাকে সম্প্রসারিত করেছে। তাই আজকের পুলিশ সংস্কারকে অতীতের কোনো একটি সরকারের একক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে, বরং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন তথা পুলিশ সংস্কার ভাবনার ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন হিসেবে দেখা অধিক ফলপ্রসূ। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার নতুন বাস্তবতায় তৎকালীন সরকার Armed Police Battalion এবং ঢাকার জন্য Metropolitan Police ব্যবস্থার বিকাশে উদ্যোগ নেয়।
পরবর্তীকালে ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে মহানগর পুলিশের কাঠামোও বড় হয়েছে। ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ঢাকায় একসঙ্গে ছয়টি নতুন থানা উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল জনসংখ্যা ও অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে থানাগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। অন্যদিকে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ পুলিশের ভেতর থেকেই Community Policing-এর একটি স্থানীয় উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৯২ সালে ময়মনসিংহে Town Defence Party-কে কেন্দ্র করে এবং পরবর্তীতে ঢাকার কিছু এলাকায় ‘প্রতিবেশী নিরাপত্তা’ বা Neighbourhood Watch ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।
আরও পরে ২০০৫ সালে Police Reform Programme-এর মাধ্যমে পুলিশকে ঐতিহ্যগত ‘Force’ ধারণা থেকে অধিকতর Professional, Accountable এবং Service-oriented police service হিসেবে গড়ে তোলার একটি বিস্তৃত প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণাতেও ২০০৫ সালের এই Police Reform Programme-কে বাংলাদেশে Community-Oriented Policing-এর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—পুলিশ সংস্কার কোনো এককালীন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান যাত্রা।
সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী পর্যায় হিসেবে বর্তমান সময়ে ঘোষিত বিএনপির ৩১ দফায় পুলিশ ও জনপ্রশাসন সম্পর্কে যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, সেটিকে আরও বাস্তবমুখী করার সুযোগ রয়েছে। ৩১ দফার সংশ্লিষ্ট অংশে দক্ষ, যোগ্য ও পেশাদার জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমার বিবেচনায়, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় সাংগঠনিক সংস্কারের পাশাপাশি পুলিশের প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যার দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিবর্তন অনেক সময় বড় ঘোষণার চেয়ে ছোট ছোট বাস্তব উন্নতির মাধ্যমে মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সময়কার Metropolitan Police ও Armed Police-এর বিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ ও আইনশৃঙ্খলার পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুলিশের বিশেষায়িত সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল মূলত Institutional Capacity Building-এর সময়। পরবর্তীকালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারগুলোর সময়ে মহানগর পুলিশ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, নতুন থানা স্থাপন এবং নাগরিক নিরাপত্তার পরিধি বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ সেই সক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করেছে। ২০০৫ সালে ঢাকায় ছয়টি নতুন থানা চালুর উদ্যোগটি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল নগরীর পুলিশি চাহিদার সঙ্গে সাংগঠনিক কাঠামোকে সামঞ্জস্য করার একটি বাস্তব উদাহরণ। অন্যদিকে ১৯৯২ সালের Community Policing উদ্যোগটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুলিশের শক্তি শুধু অস্ত্র, জনবল ও আইনি ক্ষমতায় নয়; জনগণের সহযোগিতাও পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের পুলিশ সংস্কারের পরবর্তী অধ্যায় লেখা যেতে পারে। আজকের পুলিশের বাস্তবতায় বড় সংস্কারের পাশাপাশি যে ছোট বিষয়গুলো দেখা দরকার:-
সাধারণ মানুষের কাছে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান হলো থানা। একজন মানুষ বিপদে পড়লে, জিডি করতে হলে, মামলা করতে হলে কিংবা কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য প্রথমেই থানায় যান। তাই প্রতিটি থানাকে আরও বেশি Citizen Service Centre হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। থানার প্রবেশপথে পরিষ্কার নির্দেশনা, অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এবং সেবার সম্ভাব্য সময়সীমা সহজ ভাষায় প্রদর্শন করা যেতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ যেন থানায় গিয়ে বিভ্রান্ত না হন—এটিই হতে পারে একটি ছোট অথচ অত্যন্ত কার্যকর সংস্কার।
পুলিশি সেবার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো—কাজটি কত সময়ে হবে? জিডি, অভিযোগ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, হারানো জিনিসের রিপোর্ট কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য Service Time Standard নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর ফলে নাগরিক যেমন তার প্রত্যাশা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন, পুলিশও নিজের কাজের সময়সীমা সম্পর্কে আরও সংগঠিত হতে পারবে।
একজন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে যদি তার ওপর বিপুল সংখ্যক মামলা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, আইনশৃঙ্খলা দায়িত্ব এবং অন্যান্য কাজ থাকে, তাহলে তদন্তের গভীরতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। তাই থানার সাধারণ আইনশৃঙ্খলা দায়িত্ব এবং তদন্ত কার্যক্রমের মধ্যে আরও কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সম্ভব হলে তদন্ত কর্মকর্তার Caseload-এর একটি বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
অপরাধ এখন আর শুধু রাস্তা, বাজার বা ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোন, social media, online transaction, CCTV, GPS, digital document এবং বিভিন্ন electronic communication এখন অপরাধ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই জেলা ও মহানগর পর্যায়ে Digital Investigation Support Desk গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে স্থানীয় তদন্ত কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন এবং CID, Cyber Police Centre ও অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় আরও সহজ হবে।
পুলিশের কাছ থেকে আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করি। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের জন্যও একটি মানবিক ও পেশাগত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, আবাসন, পরিবহন, অফিস সরঞ্জাম এবং পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা যেতে পারে। একজন ভালো পুলিশ সদস্যের জন্য ভালো কর্মপরিবেশ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি professional efficiency-এর পূর্বশর্ত।
আধুনিক পুলিশিং শুধু আইন জানা কিংবা শারীরিক সক্ষমতার বিষয় নয়। একজন পুলিশ সদস্যকে প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়Ñভুক্তভোগী, আসামি, শিশু, নারী, প্রবীণ, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সাধারণ নাগরিক। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণে— Emotional Intelligence, Communication Skills, Stress Management, Conflict Resolution, Human Rights, Gender Sensitivity, Child Protection, Crisis Management আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
পুলিশের ভুল নিয়ে আলোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো কাজের স্বীকৃতিও প্রয়োজন। একজন পুলিশ সদস্য জটিল মামলা দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত করলে, বিপদের সময় মানুষের জীবন রক্ষা করলে কিংবা একজন অসহায় নাগরিককে মানবিক সেবা দিলে তাকে দৃশ্যমানভাবে সম্মানিত করা যেতে পারে। প্রতিটি জেলা বা ইউনিটে Best Investigator, Best Community Police Officer, Best Citizen Service Officer ধরনের স্বীকৃতি চালু করা যেতে পারে। এটি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ইতিবাচক পেশাগত প্রতিযোগিতা তৈরি করবে।
৩১ দফায় মেধা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার যে নীতি এসেছে, সেটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার সুযোগ রয়েছে। বদলি ও পদায়নে কর্মদক্ষতা, কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ, বিশেষ প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, পুরস্কার, শাস্তিমূলক রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিটের প্রয়োজন—এসবকে একটি নির্দিষ্ট scoring framework-এর আওতায় আনা যেতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও পেশাদার হতে পারে। পুলিশ একটি বিশেষায়িত পেশা। ফলে শুধু চাকরির বয়স নয়, তদন্ত দক্ষতা, নেতৃত্ব, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, জনসম্পৃক্ততা এবং পেশাগত আচরণও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ promotion framework পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদি professional development- এ উৎসাহিত করবে। পুলিশের সেবার মান পুলিশ নিজে মূল্যায়ন করবেÑএটি প্রয়োজনীয় হলেও যথেষ্ট নয়। যে নাগরিক সেবা গ্রহণ করেছেন, তার অভিজ্ঞতাও জানা প্রয়োজন। প্রতিটি থানায় QR code বা digital feedback ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। নাগরিক জানাতে পারবেন— তিনি কত সময় সেবা পেয়েছেন, আচরণ কেমন ছিল এবং তার সমস্যার বিষয়ে যথাযথ সহায়তা পেয়েছেন কিনা। তবে অভিযোগের অপব্যবহার রোধে একটি নিরপেক্ষ verification mechanism-ও থাকা প্রয়োজন।
একজন নারী, শিশু কিংবা প্রবীণ ব্যক্তি থানায় গিয়ে সবসময় একজন সাধারণ নাগরিকের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন না। তাই থানায় vulnerable citizen-friendly policing আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। নারী ও শিশুদের জন্য privacy, পৃথক অপেক্ষার ব্যবস্থা, trained female police personnel এবং দ্রুত referral ব্যবস্থা থাকলে পুলিশি সেবা আরও মানবিক হবে। এখানে অতীতের নারী পুলিশ সংক্রান্ত বিকাশও মনে রাখা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল; পরবর্তী সরকারগুলো সেটিকে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেছে। অতএব নারী পুলিশকে আজকের ঢ়ড়ষরপরহম-এর একটি অপরিহার্য শক্তি হিসেবে আরও বিকশিত করা সময়ের দাবি।
কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের অভিযান প্রয়োজনীয়; তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনকে নিয়ে Community Prevention Programme চালু করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ early warning system তৈরি করা যেতে পারে। কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই যদি তার ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্ত করা যায়, তাহলে পুলিশ ও সমাজ যৌথভাবে তাকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। এখানে ১৯৯২ community policing এর অভিজ্ঞতা নতুনভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। ময়মনসিংহে সেই সময়ের উদ্যোগটি মূলত পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের যৌথভাবে সমস্যা সমাধানের ধারণার ওপর দাঁড়িয়েছিল। আজকের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ধারণাকে আরও আধুনিক রূপ দেওয়া সম্ভব।
ঢাকার মতো মহানগরে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি দৈনন্দিন যোগাযোগ সম্ভবত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়। তাই traffic policing-এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো যেতে পারে। CCTV, automated enforcement, traffic analytics, real-time traffic information এবং intelligent signal management-এর সঙ্গে মানবিক পুলিশিংকে যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোদ, বৃষ্টি ও দূষণের মধ্যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য, বিশ্রাম, পানি ও protective equipment-এর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা যেতে পারে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার মূল্যবান কর্মঘণ্টার একটি অংশ প্রশাসনিক কাগজপত্রে ব্যয় হয়। ছুটি, training record, welfare application, duty roster, performance assessment, বদলি এবং বিভিন্ন administrative approval ধীরে ধীরে digital workflow- এর আওতায় আনা যেতে পারে। এতে কাগজ কমবে, সময় কমবে এবং প্রশাসনিক কাজের স্বচ্ছতাও বাড়বে।
পুলিশ সংস্কারের আলোচনায় Police Commission একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এর মূল উদ্দেশ্য যদি হয় পুলিশের পেশাগত মান, জবাবদিহি, জনবান্ধবতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে এমনভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন যাতে সাধারণ নাগরিক এবং পুলিশ সদস্য— উভয়েই এটিকে আস্থার জায়গা হিসেবে দেখতে পারেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব এবং কার্যকর follow-up। একটি কমিশন তখনই অর্থবহ হয় যখন তার সুপারিশ বাস্তব ব্যবস্থাপনায় প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়— পরিবর্তন সবসময় একসঙ্গে আসেনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের Metropolitan Police ও Armed Police-এর সাংগঠনিক বিকাশ ছিল একটি বিশেষ সময়ের নিরাপত্তা-চাহিদার প্রতিক্রিয়া। বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন মেয়াদে মহানগর পুলিশের সম্প্রসারণ, নতুন থানা স্থাপন এবং পরবর্তীতে পুলিশ সংস্কারের বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে। ২০০৫ সালে ঢাকার নতুন থানাগুলো স্থাপনের উদ্যোগটি ক্রমবর্ধমান মহানগরীর পুলিশি চাহিদা মোকাবিলার একটি বাস্তব উদাহরণ। ১৯৯২ সালের community policing উদ্যোগ দেখিয়েছে যে পুলিশ ও জনগণের অংশীদারত্বের ধারণা বাংলাদেশে নতুন নয়। আর ২০০৫ সালের চPolice Reform Programme সেই চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করে professionalism, accountability, investigation, human resources এবং police public partnership-এর দিকে এগিয়ে নেয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের পুলিশ সংস্কারের ইতিহাস মূলত capacity building → metropolitan policing → community partnership → professional reform → technology-based policing— এই ধারাবাহিক বিবর্তনের একটি গল্প। এখন প্রয়োজন সেই ধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া।
বাংলাদেশ পুলিশ শুধু একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সবচেয়ে দৃশ্যমান যোগাযোগের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। একজন নাগরিক যখন থানায় যান, তখন তিনি শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন না— অনেক সময় তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গেই কথা বলেন। তাই পুলিশ সংস্কারের সাফল্য পরিমাপ করা যেতে পারে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে—
থানায় গেলে মানুষ কতটা সম্মান পান?
অভিযোগ করতে কতটা সহজ হয়?
তদন্ত কতটা দ্রুত ও পেশাদার হয়?
পুলিশ সদস্য কতটা ভালো কর্মপরিবেশ পান?
ভালো কাজের কতটা স্বীকৃতি হয়?
নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদ বোধ করেন?
প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে তদন্তে ব্যবহৃত হয়?
জনগণ কতটা পুলিশকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান মনে করেন?
বড় সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বড় সংস্কারের পাশাপাশি এই ছোট প্রশ্নগুলোর উত্তরও খুঁজে বের করা প্রয়োজন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় পুলিশকে নতুন সাংগঠনিক সক্ষমতার পথে এগিয়ে নেওয়ার যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার সময় মহানগর পুলিশ ও থানাভিত্তিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং community-oriented চিন্তার যে বিকাশ ঘটে, এবং পরবর্তী সময়ে Police Reform Programme-এর মাধ্যমে পেশাদারিত্বের যে নতুন আলোচনা শুরু হয়— সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের বাংলাদেশ পুলিশকে আরও আধুনিক করা সম্ভব। এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পুলিশ ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে পেশাদারিত্ব, ভয়ের চেয়ে আস্থা, দূরত্বের চেয়ে অংশীদারিত্ব এবং কাগজের চেয়ে সেবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৩১ দফায় যে মেধা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণভিত্তিক পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে, সেটিকে বাস্তব জীবনের প্রতিটি থানায় এবং প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত করা গেলে সংস্কারের সবচেয়ে বড় সুফলটি জনগণই অনুভব করবেন। আমাদের বিনীত প্রত্যাশা—আগামী দিনের পুলিশ সংস্কার হোক ইতিহাসের ভালো উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা, বর্তমানের বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশিংয়ের সমন্বিত রূপ। কারণ শেষ পর্যন্ত পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু জনবল, অস্ত্র বা প্রযুক্তি নয়—জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থা অর্জনের পথ শুরু হতে পারে একটি ছোট বিষয় থেকেই—একজন পুলিশ সদস্যের একটি মানবিক আচরণ দিয়ে।
সবশেষে, বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি যুগোপযোগী পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। Police Act, ১৮৬১ এবং Police Regulations of Bengal, ১৯৪৩ (PRB) এখনও বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও কার্যকরী ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। Police Act, ১৮৬১-এর অধীনে PRB প্রণীত হয়েছিল এবং PRB-তে পুলিশের প্রশাসন, দায়িত্ব, তদন্ত, রেকর্ড সংরক্ষণ, শৃঙ্খলা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের বিস্তৃত নির্দেশনা রয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান, আধুনিক মানবাধিকার ধারণা, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল প্রমাণ, কমিউনিটি পুলিশিং এবং নাগরিকের পরিবর্তিত প্রত্যাশার বাস্তবতায় এসব বিধানকে একটি সমন্বিত সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবিক, প্রযুক্তিনির্ভর, অধিকারভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও সেবামুখী করা যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রেফতার, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ, বলপ্রয়োগ, ভুক্তভোগীর অধিকার, নারী ও শিশুবান্ধব পুলিশিং, ডিজিটাল তদন্ত, নাগরিক অভিযোগ, পুলিশ সদস্যের পেশাগত স্বাধীনতা, বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও আধুনিক বিধান সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে PRB-এর পুরোনো ফরম, রেজিস্টার ও কাগজনির্ভর প্রক্রিয়াগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী digital workflow-এ রূপান্তর করা যেতে পারে; কারণ PRB-এর বর্তমান কাঠামোর একটি বড় অংশ ঐতিহাসিক প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। তবে সংস্কারের ক্ষেত্রে এর মূল্যবান operational experience ও কার্যকর বিধানগুলো সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা অধিক ফলপ্রসূ হবে। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত পুরোনোকে একেবারে বাদ দেওয়া নয়, বরং যা কার্যকর তা সংরক্ষণ, যা অপ্রাসঙ্গিক তা পরিমার্জন এবং যা নতুন বাস্তবতায় প্রয়োজন তা সংযোজন। এভাবে একটি আধুনিক Bangladesh Police Act ও যুগোপযোগী Police Regulations প্রণয়ন করা গেলে পুলিশের আইনগত ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট হবে, সদস্যদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখা পরিষ্কার হবে এবং সর্বোপরি জনগণের কাছে পুলিশকে আরও বেশি ‘force of law’ নয়, ‘service of the people’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম হবে। ইতোমধ্যে Police Headquarters এর পক্ষ থেকেও PRB-এর কিছু বিধান—বিশেষ করে সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগের ক্ষেত্রে—আধুনিক ও অধিক স্বচ্ছ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সুতরাং , বিনীত প্রত্যাশা—বাংলাদেশ পুলিশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনকে একসূত্রে বিবেচনা করে Police Act, ১৮৬১ এবং Police Regulations of Bengal, ১৯৪৩-এর একটি সুপরিকল্পিত, অংশগ্রহণমূলক ও যুগোপযোগী সংস্কার করা হোক। পুলিশ কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের সদস্য, আইনজ্ঞ, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার অভিজ্ঞতা ও মতামতকে এই প্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কারণ একটি আধুনিক পুলিশ আইন শুধু পুলিশের ক্ষমতা নির্ধারণ করবে না; একই সঙ্গে পুলিশের দায়িত্ব, নাগরিকের অধিকার, জবাবদিহির কাঠামো এবং জনগণের প্রতি পুলিশের সেবার অঙ্গীকারও স্পষ্ট করবে। আর সেই জায়গা থেকেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ পুলিশ—যে পুলিশ আইন প্রয়োগ করবে দৃঢ়তার সঙ্গে, দায়িত্ব পালন করবে পেশাদারিত্বের সঙ্গে এবং মানুষের সঙ্গে আচরণ করবে সর্বোচ্চ মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে।
লেখক: ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ

