রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ আন্দ্রেই ক্লেপাচকে রোববার (১৬ আগস্ট) বরখাস্ত করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন দেশের অর্থনীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করার জেরেই এই সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ব্যাংক ভিইবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আন্দ্রেই ক্লেপাচ ২০১৪ সাল থেকে এই পদে ছিলেন। গত মে মাসে সহকর্মীদের সামনে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি যা বলেছিলেন, তা রুশ গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
দ্য মস্কো টাইমস প্রথম এই খবর প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্লেপাচ স্বীকার করেছেন যে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ইউক্রেনের চেয়েও পিছিয়ে। যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে একসময় সামাজিক সংকট দেখা দেবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। আর এই সংকট এমন সময়ে আসবে যখন কেউ আশা করবে না।
ইউক্রেনের অর্থনীতি শিগগিরই ভেঙে পড়বে, এই ধারণাকে তিনি ভুল বলেছেন। তার কথায়, কিয়েভের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে রাশিয়া জিততে পারবে না। ইউক্রেনের সঙ্গে শক্তিক্ষয়ের প্রতিযোগিতায় আমরা জিতব না। আমাদের মধ্যে একটা বিভ্রম কাজ করছে যে ওদের সবকিছু ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা পড়েনি এবং পড়বেও না। উল্টো আমাদের খরচ দিন দিন বাড়ছে।
রাশিয়ার কোনো উচ্চপদস্থ অর্থনীতিবিদের মুখ থেকে এমন অকপট কথা শোনা যায় না। এটা প্রেসিডেন্ট পুতিনের দাবির সম্পূর্ণ উল্টো। পুতিন বরাবরই বলে আসছেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া সামলে নিয়েছে এবং ইউক্রেনের অর্থনীতি ধসে পড়া শুধু সময়ের ব্যাপার।
ভিইবি ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ জানায়নি। তবে ব্যবসায়িক গণমাধ্যম বেদোমোস্তিকে ক্লেপাচের এক পরিচিতজন জানিয়েছেন, তার বিদায় দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যক্তিগত ও কঠোর মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত। যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে মেলে না।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দ্য বেল সূত্রে জানিয়েছে, ক্রেমলিনের সরাসরি নির্দেশেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মে মাসের সেই বক্তব্যের সঙ্গেই তার চাকরি হারানোর সম্পর্ক রয়েছে।
এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, ক্রেমলিনে আনুগত্যের চাপ কতটা বাড়ানো হয়েছে। পুতিন এখন এমন কর্মকর্তাদের ঘিরে থাকছেন, যারা তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সাহস রাখেন না।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক উপদেষ্টা ও কার্নেগি সেন্টারের ফেলো আলেক্সান্দ্রা প্রোকোপেনকো ক্লেপাচকে একজন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্লেপাচকে সরিয়ে দিলেও তিনি যে আসন্ন আর্থিক সংকটের কথা বলেছিলেন, তা এড়ানো যাবে না। তার পূর্বাভাসগুলো কাউকে খুশি করার জন্য নয়, বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে কিছুটা হতাশাজনক হলেও সেগুলো বস্তুনিষ্ঠ ছিল।
২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অর্থনীতি এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। যুদ্ধের বিশাল খরচ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আর তেল-গ্যাস খাতে ইউক্রেনের ক্রমাগত হামলা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই বাজেট ঘাটতি পৌঁছেছে ৫.৮৭ ট্রিলিয়ন রুবলে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ৩.৭৯ ট্রিলিয়ন রুবলের চেয়ে অনেক বেশি। পুতিনের নিকটতম কিছু উপদেষ্টা গোপনে তাকে সতর্ক করেছেন যে বর্তমান খরচ দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি রাশিয়ার বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের কয়েকটি গুদামে ইউক্রেনীয় হামলায় শত শত কোটি ডলারের পণ্য ধ্বংস হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং হাজার হাজার স্বাধীন বিক্রেতা বিপাকে পড়েছেন।
এসব সত্ত্বেও পুতিন যুদ্ধ সংকুচিত করা বা খরচ কমানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং ছোট ব্যবসার ওপর কর বাড়িয়ে এবং ধনী ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা চলছে।
এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পর তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া কিছুটা বাড়তি রাজস্ব পাচ্ছে। এই সাময়িক স্বস্তি মস্কোর ওপর চেপে বসা চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করছে।

