মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা আখ্যা দিয়ে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)। সোমবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়, ২০১৭ সালের সামরিক অভিযান এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে মিয়ানমারের দেওয়া তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
ইউসিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার নিজেদের রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত অপরাধ আড়াল করতে এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহি এড়াতেই পরিকল্পিতভাবে এই মিথ্যাচার করছে। রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ইতিহাস ও সংস্কৃতি রয়েছে। এই জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করাই মূলত তাদের ওপর হওয়া দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়নের প্রধান কারণ।
মিয়ানমার সরকার ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ বলে দাবি করলেও, এটিকে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট গণহত্যা বলছে ইউসিআর। সংগঠনটির দাবি, আরসার বিচ্ছিন্ন হামলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ওই সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালায়।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০১৭ সালের ওই অমানবিক অভিযানের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এর আগে ১৯৯১-৯২ সালে আসা শরণার্থীদের হিসাব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া রাখাইনে এখনো যে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা রয়ে গেছেন, তাঁরাও নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে মানবেতর জীবন পার করছেন।
প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার যে ‘যাচাইকরণ’ প্রক্রিয়ার কথা বলছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছে ইউসিআর। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে নিবন্ধিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনেককে অযাচাইযোগ্য বা সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নিজ দেশে ফেরার অধিকার থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মাধ্যমে পরিচালনার দাবি জানিয়েছে তারা।
রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিচারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। ইউসিআর স্পষ্ট জানিয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাই পূর্ণ নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের আইনি নিশ্চয়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরবে না। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অপপ্রচার বন্ধে এবং রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার নিশ্চিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের দাবি জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুনরায় ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করা হয়, ‘রোহিঙ্গা’ নামে দেশটিতে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই। ওই বিবৃতিতে রাখাইন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে বাংলাদেশ থেকে তিন লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল দেশটি।

