বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস বাংলাদেশ’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি। এআইনির্ভর সিসিটিভি ক্যামেরা, বডি ক্যামেরা, বডি স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার, মোবাইল ডিটেক্টর ও মোবাইল জ্যামিং সিস্টেমসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে কারা অধিদপ্তর।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর কারা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, মানবিক, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারাগারে বডি স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার, মোবাইল ডিটেক্টর, গ্রাউন্ড সুইপিং মেশিন ও মোবাইল জ্যামার ব্যবহার করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কারা সদস্যদের বডি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
দেশের কারাগারগুলোকে কারা অধিদপ্তরের নিজস্ব ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম ও টিম ট্র্যাকার চালু করা হয়েছে।
ডিজিটাল হচ্ছে বন্দি ব্যবস্থাপনাও
শুধু নিরাপত্তা নয়, বন্দি ব্যবস্থাপনাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। মোতাহের হোসেন বলেন, তথ্যভিত্তিক বন্দি ব্যবস্থাপনার জন্য বন্দীদের বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার (Comprehensive Prisoner Database) সমৃদ্ধ করা হয়েছে। বন্দিদের টেলিফোন কল ও সাক্ষাৎ ব্যবস্থাও ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া এআইনির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারাগার থেকেই ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে বন্দিদের বিচার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিভিন্ন কারাগারে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও অন্যান্য মানসিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালু রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভিডিও কলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
পাঁচ কারাগার থেকে পালিয়েছিল ২,২৪৭ বন্দি
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজনস বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরে হামলা, ভাঙচুর ও বিদ্রোহের সুযোগে পাঁচটি কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৪৭ বন্দি পালিয়ে যায়। এ সময় বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। শুধু নরসিংদী কারাগার থেকেই পালিয়ে যান ৮২৬ বন্দি।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৮৭ জন গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণ করেছেন। এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬৬ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য শনাক্ত করা যায়নি।
এক বছরে জব্দ ৩ হাজারের বেশি মোবাইল
কারাগারে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফোনে কথা বলা বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মোতাহের হোসেন বলেন, কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। গত এক বছরে কারাগার থেকে ৩ হাজারের বেশি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
কারাগারে মাদক প্রবেশ ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বন্দি কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারী—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। মাদক শনাক্তে কারা সদর দপ্তরে মাদক টেস্টিং মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে।
নতুন ১,৮৯৯ পদ অনুমোদন
কারাগারের নিরাপত্তা জোরদারে জনবল সংকট নিরসনে নতুন করে ১ হাজার ৮৯৯টি পদ অনুমোদন করা হয়েছে বলেও জানান আইজি প্রিজনস।
বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্যাথলজি ল্যাব চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের সুপারিশ পাওয়া গেছে এবং ৭৭টি অ্যাম্বুলেন্স টিঅ্যান্ডইভুক্ত করা হয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক জানান, ‘বাংলাদেশ জেল’ এর নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন ও বিধিবিধানও যুগোপযোগী করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস অ্যাক্ট-২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

