দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আগামীকাল ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনের জন্য সব ধরনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।
তবে এবারের নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ‘ওপেন’ ব্যালটে ভোট দেবেন। ফলে কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তা উপস্থিত সবার কাছেই দৃশ্যমান থাকবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বুধবার (১৯ আগস্ট) গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দীন।
সাধারণত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ সচিব ব্রিফ করে থাকেন। তবে আইনের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব সিইসির ওপর ন্যস্ত থাকায়, এই বিশেষ ও ঐতিহাসিক সময়ে তিনি নিজেই সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান সিইসি।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে সিইসি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর ওই দিনই ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে এ বিষয়ে গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে এই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মাঝে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব মহড়া ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও বিধিমালার আলোকে নির্বাচন কমিশন এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি নিজেই সংসদ সদস্যদের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১১ আগস্ট ন্যূনতম সাত দিন সময় রেখে এই সংক্রান্ত গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচন কমিশন আগেই ভোটার তালিকা ও তফসিল প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে দুটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় ড. অলি আহমদের নামে এবং বর্তমান সরকারি দল বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে। পরবর্তীকালে ১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহায়তায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার দিনের মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি বাড়তি হিসেবে গণ্য হওয়ায় চূড়ান্তভাবে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে কোনো প্রার্থীই নাম প্রত্যাহার করেননি।
ভোটার তালিকার ক্রমিকে কিছুটা বৈচিত্র্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সিইসি জানান, সংসদীয় সীমানার সিরিয়াল অনুযায়ী পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানে গিয়ে ৩০০ আসন শেষ হলেও এই নির্বাচনে মূলত সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী ভোটিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা শূন্যতার কারণে ভোটার তালিকায় বিভক্তি নম্বরে কিছুটা ডিসকন্টিনিউইটি রয়েছে। তবে তা নিয়মানুগভাবেই সমাধান করা হয়েছে এবং মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জন। ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
নির্বাচন পরিচালনার জন্য স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং সে অনুযায়ী কমিশন পরামর্শক্রমেই সব সূচি নির্ধারণ করেছে বলে জানান সিইসি। ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল ৫টার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে ভোট গণনা শুরু হবে এবং ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন সিইসি নিজে। পুরো গণনার প্রক্রিয়া থাকবে শতভাগ স্বচ্ছ। নির্বাচন চলাকালীন ও ভোট গণনার সময় সংসদ সদস্যরা কক্ষে উপস্থিত থাকতে পারবেন। ভোটার ও প্রার্থীদের নাম ব্যালট পত্রে স্পষ্ট উল্লেখ থাকায় কে কাকে ভোট দিচ্ছেন তা উপস্থিত সবার কাছে উন্মুক্ত থাকবে। ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ফলাফল গণনার পর্বটি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি স্পষ্ট করেন যে, সংসদ ভবনের ভেতরের পরিবেশ ও বিধিমালা বজায় রাখার দায়িত্ব স্পিকারের, যা তাদের নিজস্ব আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে ভোটের দিন হাউজের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। এছাড়া এই নির্বাচনকে ঘিরে অতিরিক্ত বা কোটি কোটি টাকা খরচের খবর গুজব ছাড়া কিছু নয় বলে তিনি জানান। সংসদের বৈঠক ডাকার মতো নিয়মিত বিষয় এবং কিছু ব্যালট ও স্টেশনারি ছাড়া কমিশনের আলাদা কোনো বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় বা অতিরিক্ত বাজেট তৈরি হয়নি।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে উল্লেখ করে সিইসি নাসির উদ্দীন আশা প্রকাশ করেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হবে।

