প্রান্তিক পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক ব্রয়লার খামারি রোগ প্রতিরোধের জন্য সুস্থ মুরগিকেও নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক দেন। এসব খামারির অনেকেই জানান, বাচ্চা, খাবার ও ওষুধ বিক্রেতা ডিলারদের পরামর্শে তারা ওষুধ ব্যবহার করেন। এভাবে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে মানুষের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
সুস্থ মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে খামারে থাকা জীবাণু ধীরে ধীরে ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, ব্যাকটেরিয়া ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠলে এসব জীবাণুর সংক্রমণ চিকিৎসা করা কঠিন, এমনকি অসম্ভবও হয়ে যেতে পারে। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।
তবে বিভিন্ন পোলট্রি কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক খামারিরা কোম্পানিতে কর্মরত ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের কাছ থেকে কারিগরি পরামর্শ পান। তারা বায়োসিকিউরিটি বা জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রেখে রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এর মধ্যে রয়েছে মুরগির ঘরের চারপাশে বেড়া দেওয়া এবং ঘরে প্রবেশের আগে হাত-পা পরিষ্কার করা। এসব খামারি সাধারণত অসুস্থ মুরগির চিকিৎসার জন্যই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন এবং মুরগি বিক্রির অন্তত ১০ দিন আগে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া বন্ধ করেন। এটিকে উইথড্রয়াল পিরিয়ড (withdrawal period) বলা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো মাংসে যেন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ না থাকে তা নিশ্চিত করা।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কোলিগ্রাম নারায়ণপুরের স্বাধীন খামারি ৪৯ বছর বয়সী মোখলেসুর রহমান পাঁচ বছর ধরে ব্রয়লার মুরগি পালন করছেন। এ কাজে তিনি ডিলারদের কাছে ঋণগ্রস্ত। প্রতিটি ব্যাচের মুরগির জন্য ওষুধ বাবদ গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ করেন তিনি। এর প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হয় অ্যান্টিবায়োটিকের পেছনে।
এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে গত ১৮ আগস্ট তিনি বলেন, ‘৩৫ দিনের চক্রে আমি চারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি। রোগ দেখা দেওয়ার পর একবার ওষুধ দিয়ে কী লাভ? অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করলে ঝুঁকি বেশি।’
চারঘাটের ডাকরার আরেক খামারি ৪২ বছর বয়সী মুরাদ সরকার জানান, ১ হাজার ২০০টি মুরগি পালনে তিনি ওষুধের পেছনে ৭ হাজার টাকারও বেশি খরচ করেছেন, যার বেশিরভাগই অ্যান্টিবায়োটিক। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি। আমাদের বিশ্বাস, অ্যান্টিবায়োটিক রোগ প্রতিরোধ করে।’
পুঠিয়ার বানেশ্বর মুচিপট্টির ২৮ বছর বয়সী তরুণ ডিলার বাহাদুর সরকার প্রায় ১০০ জন খামারির সঙ্গে ব্যবসা করেন। তিনি স্বীকার করেন, ব্রয়লার খামারে ব্যবহৃত ওষুধের মোট খরচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অ্যান্টিবায়োটিকের পেছনে যায়। তিনি বলেন, ‘কিছু খামারি বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা মেনে চলেন, আবার কেউ তা করেন না।’
খামারে অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সালমোনেলা ও ই. কোলাইয়ের মতো ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। এসব অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটালে রোগের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।
মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, পোলট্রি খামারে অ্যামোক্সিসিলিন, নিওমাইসিন, কোলিস্টিন, এনরোফ্লক্সাসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং ডক্সিসাইক্লিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোলিস্টিন ও সিপ্রোফ্লক্সাসিন মানুষের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক। তাই সুস্থ খামারের পশুপাখিকে এসব অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়।
অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে উইথড্রয়াল পিরিয়ড ১০ দিন। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর ১০ দিন পর্যন্ত কৃষকের মুরগি বিক্রি করা উচিত নয়। তবে সিপ্রোফ্লক্সাসিনের ক্ষেত্রে উইথড্রয়াল পিরিয়ড ১৫ থেকে ১৯ দিন। তাই খামারিদের অবশ্যই নির্ধারিত উইথড্রয়াল পিরিয়ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর ব্যবহার এড়িয়ে চলার বিষয়ে তাদের যথাযথভাবে নির্দেশনা দিতে হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ডিলাররা অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে লাভ করেন এবং অনেক সময় ছোট খামারিদের বেশি অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে চাপ দেন। যেহেতু অনেক খামারি ডিলারদের কাছ থেকে বাকিতে বাচ্চা বা খাবার কেনেন, তাই ডিলাররা যে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করতে চান তা নিতে অস্বীকৃতি জানানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, ‘মুরগির ঘরের চারপাশে বেড়া দেওয়া এবং ঘরে প্রবেশের আগে সাবান দিয়ে হাত-পা ধোয়ার মতো বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজী ফার্মসের চুক্তিভিত্তিক খামারিরা আমাদের কারিগরি দলের কাছ থেকে পরামর্শ পান। আমরা কখনোই সুস্থ মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পরামর্শ দিই না। যদি কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং অসুস্থ মুরগির চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়, তাহলে চিকিৎসার পর নির্দিষ্ট কয়েক দিন মুরগি বিক্রি না করার পরামর্শ দিই, যাতে মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো অবশিষ্টাংশ না থাকে।’
চারঘাটের চুক্তিভিত্তিক খামারি ও ২৫তম ব্যাচের গ্রোয়ার ৪৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ জাহিদ হাসান বলেন, তারা শুধুমাত্র রোগের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন না হলে এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আমরা মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দিই না। চুক্তিভিত্তিক খামার ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্নতাসহ বায়োসিকিউরিটি প্রটোকল মেনে চলতে হয়।’
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর কখন মুরগি বিক্রি করেন— এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাংসে কোনো অবশিষ্টাংশ না থাকার জন্য তারা অন্তত ১০ দিনের উইথড্রয়াল পিরিয়ড মেনে চলেন।
চারঘাটের মেরামতপুরের আরেক চুক্তিভিত্তিক খামারি ২৯ বছর বয়সী হাসান আলীও একই কথা বলেন। তিনি জানান, তিনি খুব কমই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। ব্যবহার করলে মুরগি বিক্রির আগে ৭ থেকে ১০ দিনের উইথড্রয়াল পিরিয়ড মেনে চলেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান সিকদার বলেন, প্রান্তিক খামারিরা যেসব ডিলারের সঙ্গে ব্যবসা করেন, তাদের পরামর্শের ভিত্তিতেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ থাকার সম্ভাবনা কমাতে কঠোরভাবে ১০ দিনের উইথড্রয়াল পিরিয়ড মেনে চলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের পেছনে খরচ করার পরিবর্তে বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা বজায় রেখে কম খরচে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

