প্রয়োজন পরিকল্পিত, সমন্বিত ও বহুমুখী জ্বালানি কৌশল

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩০

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত এক বৎসরে দেশে জ্বালানি তৈল আমদানির খরচ দ্বিগুণ হইয়াছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সৃষ্টিসহ নানা কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়া গিয়াছে জ্বালানি তৈলের মূল্য। এই জন্য গত ২০২৫-২৬ অর্থবৎসরে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে আমাদের ব্যয় হইয়াছে প্রায় ১ হাজার ৬৪ কোটি ডলার। অথচ তাহার পূর্বের অর্থবৎসরে (২০২৪-২৫) ব্যয় ছিল ৫১৪ কোটি ডলারের কম। অর্থাৎ এক বৎসরে জ্বালানি তৈল আমদানিতে খরচ বাড়িয়াছে ৫৫০ কোটি ডলার বা ১০৭শতাংশ। 

সরকারের পক্ষ হইতেও বলা হইতেছে যে, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানিসংকট তৈরি হইয়াছে। ইহার প্রভাব পড়িয়াছে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহে। ইহাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়াছে গ্যাসের সংকট। কোথাও কোথাও গ্যাসের অভাবে কলকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হইতেছে। পেট্রোল ও সিএনজি পাম্প স্টেশনগুলিতে বাড়িতেছে বিভিন্ন প্রকার গাড়ির লাইন। গ্রামাঞ্চল তো বটে, খোদ রাজধানী ঢাকা শহরেও বাড়িয়া গিয়াছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা থাকিলেও অর্থের অভাবে জ্বালানি ক্রয় করিতে না পারায় বা আন্তর্জাতিকভাবে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এখন খুবই নাজুক।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারসংকটে সরকার বেকায়দায় পড়িয়াছিল। উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে এই বারও কি তাহার পুনরাবৃত্তি ঘটিতে যাইতেছে-এমন প্রশ্ন উঠিতেছে বিভিন্ন মহল হইতে। আমরা জানি, আন্তর্জাতিকভাবে জ্বালানিসংকট রহিয়াছে বটে, তবে অনেক দেশ ইতিমধ্যে সংকটের মধ্যেও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সফল হইয়াছে। আমরা ইতিপূর্বে ইউরোপের অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারি। তাহারা জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয়ের দিকে অধিক মনোযোগী হন। ইহার পাশাপাশি বিকল্প উৎস হইতেও জ্বালানি আমদানির উপর গুরুত্বারোপ করেন; কিন্তু আমরা যদি শুধু আন্তর্জাতিক সংকটের দোহাই দিই কিংবা তাহার অজুহাত তুলিয়া দায়দায়িত্ব এড়াইয়া চলি, তাহা হইলে তাহা ন্যায়সংগত ও বুদ্ধিমানের কাজ হইবে না। এই আধুনিক যুগে জ্বালানিচাহিদা আজকাল এতটাই অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে যে, ইহা এখন মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। আবার ইহা এমন এক স্পর্শকাতর বিষয় যাহার কারণে জনমত যে কোনো সময় সরকারের বিরুদ্ধে চলিয়া যাইতে পারে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় ইহাকে অবহেলার চোখে না দেখিয়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লইয়া অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশে বহু বৎসর ধরিয়া নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যেন অরণ্যে রোদনে পরিণত হইয়াছে। এই সংক্রান্ত ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের চাওয়াপাওয়া বারংবার অগ্রাহ্য করা হইয়াছে। তাই স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইলে প্রথমত আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রতি গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। কেননা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত এখনো গ্যাসের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। এই জন্য বিশেষত বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার প্রদান করা প্রয়োজন। ইহার সহিত ভবিষ্যৎ জ্বালানির নিরাপত্তার জন্য বিকল্প জ্বালানির ভিত্তি শক্তিশালী করা আবশ্যক। এই ক্ষেত্রে রুফটপ সোলারের কথা ভাবা যাইতে পারে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করিলে ইহার একটি কার্যকর সুফল পাওয়া যাইতে পারে। দেশে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সৌর সেচপাম্প স্থাপনের যে উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে তাহারও সম্প্রসারণ জরুরি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুতের প্রসারে অনশোর ও অফশোর উইন্ড পাওয়ার প্রকল্প গ্রহণ করা যাইতে পারে। আরেকটি বিকল্প ব্যবস্থা হইল-জৈব বর্জ্যকে জ্বালানি সম্পদে রূপান্তর। এই জন্য গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনে আমরা মনোযোগী হইতে পারি। ইহা ছাড়া যেই সকল শিল্পে সম্ভব, সেইখানে সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর পরিবর্তে দক্ষ বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াইতে হইবে। শিল্পের মোটর, পাম্প, কমপ্রেশার ও বয়লারকে আধুনিক করিতে হইবে। গ্রিড আধুনিকীকরণে দৃষ্টি দিতে হইবে। মোট কথা, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গবেষণা বৃদ্ধি ও বিশেষ ফান্ড গঠনের পাশাপাশি গড়িয়া তুলিতে হইবে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও বহুমুখী বিদ্যুৎব্যবস্থা।

ইত্তেফাক/এমএস