বেনাপোলের সীমান্তবর্তী উপজেলা শার্শার সোনামুখো বিলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে অক্সিজেনসংকট সৃষ্টি হয়ে আনুমানিক সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে বলে দাবি করেছেন ঘের মালিকপক্ষ।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত থেকে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলের সজনের ঘেরে মাছের এই আকস্মিক মড়ক শুরু হয়। পরদিন সকাল হতে না হতেই বিপুল পরিমাণ পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে পানির ওপরে ভেসে ওঠে। খামার মালিকদের দাবি, দিনে-রাতে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হওয়ায় ঘেরে আধুনিক পদ্ধতির অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়। এ ঘটনার পর উপজেলার অন্যান্য এলাকার মত্স্যচাষিরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
সোনামুখো বিলের এ ঘেরটির মালিকানা এ এফ মত্স্য খামারের। যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন। খামার মালিকদের হিসাবে, ২০০ বিঘা ঘেরে ৬০ লাখ পিস পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল। প্রতি ১৫টি পাবদা মাছে প্রায় এক কেজি হিসেবে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার মণ। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ মাছের দাম প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাছের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা। মাছগুলো বাজারজাত ও ভারতে রপ্তানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল।
খামার মালিক আলফাজুল হক বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। পরে বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘মাছের খাদ্য বাবদ বাকিতে বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মালামাল নিয়েছি। এই ঋণ কীভাবে শোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
অন্য খামারি ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছি। হয়তো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না। এই খামারের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০০ পরিবার নির্ভরশীল।’ তিনি বলেন, ‘রাত ১টার পর থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সকাল হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছ মারা যায় এবং পচতে শুরু করে।’
সরেজমিনে ঘের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানির ওপর অসংখ্য মৃত মাছ ভেসে রয়েছে। বিকট দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও পরিশ্রম এক রাতের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, এ খামারে উৎপাদিত পাবদা মাছের একটি অংশ রপ্তানি চেইনের মাধ্যমে ভারতে যায়। ফলে এ ধরনের মাছ চাষ শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণই করে না, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে। ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষিদের অভিযোগ, মাছের মড়ক শুরু হওয়ার পর থেকে শার্শা উপজেলা প্রশাসন, মত্স্য অধিদপ্তর বা বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে খোঁজখবর নেননি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
মাছচাষিরা বলেন, লোডশেডিং এখন শুধু একটি খামারের সমস্যা নয়। দিন রাত ঘণ্টায় বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় উপজেলার অন্য এলাকার মত্স্যচাষিরাও উদ্বিগ্ন। আধুনিক পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল বড় বড় ঘেরগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে তারাও একই ধরনের বিপর্যের মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় মত্স্যচাষিদের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।

