হারানো ছাগল খুঁজতে গিয়ে মিলল সোনার খনি

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:০০

হারিয়ে যাওয়া ছাগল খুঁজতে গিয়ে সোনার সন্ধান পেয়েছিলেন কেনিয়ার এক ছাগলপালক। তার সেই আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রত্যন্ত গ্রামটিতে শুরু হয়েছে স্বর্ণসন্ধানীদের ভীড়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে, একপর্যায়ে সোনার সন্ধানে এলাকাটিতে এসেছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ।

পশ্চিম কেনিয়ার ওয়েস্ট পোকট কাউন্টির চেপোরোরে আগে ছিল ঝোপঝাড় ও পশুচারণের জমি। এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য গর্ত, মাটির স্তূপ ও অস্থায়ী খনিশিবির।

৩৩ বছর বয়সী ছাগলপালক মান্দেসে লোমাচার জানান, হারিয়ে যাওয়া একটি ছাগল খুঁজতে গিয়ে তিনি নদীর তীরে একদল নারীকে সোনা খুঁজতে দেখেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েই তিনি সোনার সন্ধান পান।

পরে প্রায় তিন গ্রাম সোনা বিক্রি করে ৩৬ হাজার কেনিয়ান শিলিং, অর্থাৎ প্রায় ২৮০ ডলার পান তিনি। তার এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই চেপোরোরে মানুষের ঢল নামে।

তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, লোমাচারের আবিষ্কারই যে গোল্ড রাশের একমাত্র কারণ, তা নিশ্চিত নয়। আগস্টের শুরুতে একই এলাকায় আরও দুটি উল্লেখযোগ্য সোনার সন্ধান পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেই খবর নানা গুজব ও অতিরঞ্জিত দাবির মাধ্যমে আরও বড় আকার ধারণ করে।

সোনার আশায় কৃষক-শ্রমিকদের ভিড়

চেপোরোরে আসা মানুষের অধিকাংশই দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সন্তানদের স্কুলের খরচ মেটাতে বাড়তি আয়ের আশায় অনেকেই সোনার সন্ধানে নেমেছেন।

১৮ বছর বয়সী আবিগায়েল চেলেংগাত আগে কখনো খনিতে কাজ করেননি। স্কুলের ফি পরিশোধ এবং ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনায় সহায়তার আশায় তিনিও সোনার খোঁজে এসেছেন।

দিনভর শত শত মানুষ কোদাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে মাটি-পাথর খুঁড়ছেন। কেউ সেই মাটি নিয়ে যাচ্ছেন কাছের মৌসুমি নদীতে। সেখানে নারী-পুরুষ বাটি দিয়ে কাদা ও বালু ধুয়ে সোনার ক্ষুদ্র কণা খুঁজছেন।

১০ হাজার থেকে কমে এখন ২,৫০০

স্থানীয় ডেপুটি কমিশনার স্যামুয়েল কিয়ারির হিসাবে, গোল্ড রাশের চূড়ান্ত সময়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ চেপোরোরে জড়ো হয়েছিলেন। তবে সোনা না পেয়ে অনেকে ফিরে যাওয়ায় এখন সেখানে প্রায় ২,৫০০ মানুষ রয়েছেন।

কিয়ারি জানান, স্থানীয় ছোট পরিসরের সোনা ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ জনের কাছ থেকে সোনা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে পাওয়া ধাতুর সবটাই যে আসল সোনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

কিছু মানুষের পাওয়া সোনার মূল্য কয়েকশ কেনিয়ান শিলিং থেকে শুরু করে প্রায় ৭৮ হাজার শিলিং বা ৬০০ ডলার পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়েছে।

উগান্ডা থেকেও ছুটে আসছেন মানুষ

সোনার খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিবেশী উগান্ডা থেকেও অনেকে চেপোরোরে এসেছেন। উগান্ডার বুসিয়া থেকে আসা খনি শ্রমিক মুগিশা গডফ্রে জানান, বন্ধুর কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি প্রায় ১ লাখ উগান্ডান শিলিং খরচ করে সেখানে পৌঁছেছেন।

কিন্তু এখনো কোনো সোনা পাননি তিনি। গডফ্রের ভাষায়, সেখানে গাছের নিচে ঘুমিয়ে দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে। তবু সোনা না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে রাজি নন তিনি।

সোনার সঙ্গে গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসা

খনিশিবির ঘিরে নতুন ব্যবসারও সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, এরই মধ্যে ২০০টির বেশি ব্যবসা গড়ে উঠেছে। খাবার, পানি, কোমল পানীয়, রুটি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

তবে বিপুল মানুষের আগমনে এলাকাটির দুর্বল অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। নেই পাইপলাইনের পানি, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা।

নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যৌন সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে নিরাপত্তা টহল বাড়িয়েছে প্রশাসন। রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।

সোনার মজুত কতটা, এখনো অজানা

চেপোরোরে সোনা পাওয়া গেছে—এ নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই। কিন্তু মাটির নিচে সোনার মজুত কতটা এবং তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ইতোমধ্যে কয়েক ট্রাক মাটি ও পাথর কাছের অর্টুম শহরে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আর এই ফলাফলের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে—ছাগল খুঁজতে গিয়ে লোমাচারের পাওয়া সোনা সত্যিই কি একটি বড় খনির সন্ধান, নাকি ক্ষণস্থায়ী এক গোল্ড রাশের সূচনা।

সূত্র: বিবিসি

ইত্তেফাক/এএম