অস্ট্রেলিয়ার মিউজিক চার্ট থেকে নিষিদ্ধ হলো এআই দিয়ে তৈরি গান

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৬

অস্ট্রেলিয়ার সংগীতের শীর্ষ তালিকা বা অফিসিয়াল চার্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি গান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহ থেকেই কার্যকর হওয়া নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো গান তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে হলে তা উল্লেখযোগ্যভাবে ‘মানুষের সৃষ্টি’ হতে হবে। শিল্পচর্চায় মানুষের মৌলিক শৈল্পিক গুণাবলিকে প্রাধান্য দিতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এরিয়া)।

সম্প্রতি দেশটির ডিজে জশ ফাওয়াজের তৈরি একটি গানকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হলে কর্তৃপক্ষ এই কঠোর সিদ্ধান্তের পথে হাঁটে। পপ তারকা ম্যাডোনার বিখ্যাত গান ‘লাইক আ প্রেয়ার’-এর একটি এআই সংস্করণ তৈরি করেছিলেন ফাওয়াজ। গানটি এরিয়ার ড্যান্স চার্টের শীর্ষস্থান দখল করে এবং দেশটির সামগ্রিক জাতীয় তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। রেডিওতে ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি কেবল স্পটিফাই প্ল্যাটফর্মেই গানটি ৪ কোটি ৮০ লাখবারের বেশি শোনা হয়। তবে সংগীত মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে ফাওয়াজ পরবর্তীতে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে গানটি তৈরিতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা হয়েছিল।

এরিয়া স্পষ্ট জানিয়েছে, সংগীতের এই চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে কোনো ধরনের মানবিক সৃজনশীলতা ছাড়া কেবল কম্পিউটারে প্রস্তুতকৃত গানের সাফল্যকে তারা স্বীকৃতি দিতে আগ্রহী নয়। নতুন নিয়ম অনুসারে, কোনো গানে এআই প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও মূল গানটির কথা মানুষের লেখা হতে হবে এবং প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও মূল বাদ্যযন্ত্রে মানুষের সরাসরি উপস্থিতি থাকতে হবে। তবে গানের মাস্টারিং, ড্রাম মেশিন কিংবা অটো-টিউনের মতো প্রাথমিক প্রযুক্তিগত কাজে এআই ব্যবহারে কোনো বাধা থাকছে না।

নতুন নীতি অনুযায়ী, চার্টে স্থান পেতে হলে শিল্পীদের গান জমা দেওয়ার সময়ই এআই ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য ঘোষণা করতে হবে। এরিয়া সতর্ক করেছে, পরবর্তীতে যদি প্রমাণিত হয় কোনো গান মূলত এআই দিয়ে তৈরি, তবে চার্ট থেকে তার অবস্থান বাতিল করা হবে। এমনকি গানটি শীর্ষস্থান অর্জন করে থাকলে তার জন্য দেওয়া সম্মাননা বা পুরস্কারও ফেরত নেওয়া হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এরিয়ার প্রধান নির্বাহী অ্যানাবেল হার্ড বলেন, ‘সংগীতজগতে মানুষের নিজস্ব সৃজনশীলতাকে টিকিয়ে রাখতেই এই সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা হয়েছে। শিল্পীরা কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করতেই পারেন, কিন্তু শিল্পীদের সৃষ্টিকে ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপাদিত গান সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। অনুমতি ছাড়া এআই দিয়ে তৈরি গানকে তালিকায় পুরস্কৃত করা হলে তা মূল রেকর্ডকৃত সংগীতের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে।’

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়াও তাতে যুক্ত হলো। চলতি বছরের শুরুর দিকে সুইডেনের মিউজিক চার্ট থেকেও এআই গান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ফোনোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি (আইএফপিআই) লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের নীতিমালা চালুর নির্দেশ দিয়েছে।

অন্যদিকে, অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ দেশের শিল্পীদের সুরক্ষায় জোরালো সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, অনুমতি ছাড়া এবং উপযুক্ত সম্মানী না দিয়ে এআই প্রশিক্ষণে শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম ব্যবহার করা সরাসরি চৌর্যবৃত্তির শামিল। স্থানীয় সংগীতশিল্পীরাও নতুন এই নীতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানুষের শিল্পানুভূতির স্থান কখনোই দখল করতে পারে না।

ইত্তেফাক/এনএন