জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বেরিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, এনসিপি জোট ছাড়ছে—এমন কোনো বিষয় তাদের বা এনসিপির কারও রাজনৈতিক আলোচ্যসূচিতে নেই। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় আসনের প্রতি সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলে অচিরেই একটি দক্ষ ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রক্রিয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা এসব কথা বলেন। এ সময় এনসিপি এবং জামায়াতসহ সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জোট থেকে এনসিপির সম্ভাব্য প্রস্থান সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, এটা এনসিপিরও এজেন্ডা না, আমাদেরও এজেন্ডা না। মানে যার বাড়িতে বিয়ে তার কোনো ঠেকা নাই, আর পাড়া–পড়শির ঘুম নাই—এ রকম আরকি বিষয়টা।’
তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাদের এই সমঝোতা কোনো স্থায়ী বা আনুষ্ঠানিক জোটের কাঠামো নয়; বরং একটি কার্যকর নির্বাচনী সমঝোতা ছিল এবং বর্তমানে জনগণের মৌলিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা যুগপৎভাবে রাজপথের আন্দোলন পরিচালনা করছেন।
জোট থেকে দলগুলোর বেরিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে চারদলীয় ঐক্যজোটের পরিসর ক্রমান্বয়ে ১৮, ২০ এবং একপর্যায়ে ২৭ দলে উন্নীত হয়েছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রে যে কারও নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে এবং কারও ওপর জোর খাটানোর সুযোগ নেই। তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে এই ঐক্যের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়াতে বিরোধী দলের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের বিষয়ে জামায়াত আমির জানান, এ নিয়ে ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক প্রস্তুতি বা ‘হোমওয়ার্ক’ শুরু হয়েছে। কেবল শরিক দলের যোগ্য ব্যক্তিরাই নন, বরং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মেধা বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ যুক্ত করে কার্যকর একটি ছায়া মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করা হবে।
সংসদ ও মাঠপর্যায়ে বিরোধী দলের অধিকার খর্ব করার অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকার তুলনায় বিরোধীদলীয় আসনগুলোতে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারদলীয় দায়িত্বশীল নেতারা জনসমক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন যে—ভোট জামায়াতকে দিলে উন্নয়ন ক্ষমতাসীনদের কাছে চাওয়া যাবে না। অথচ সাংবিধানিকভাবে উন্নয়ন কোনো অনুকম্পা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এ ছাড়া সংসদীয় রীতি ও সংবিধানের বাইরে গিয়ে বিরোধীদলীয় আসনগুলোতে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের উদাসীনতার অভিযোগ এনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ টেকসই সংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট গণরায় দিলেও জাতীয় নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর সরকার সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে। সরকার সংকট সমাধানের পথ এড়িয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বিরোধীদের রাজপথে নামতে হয়েছে।
অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সামগ্রিক বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ ও রাজপথের এই ঐক্য অটুট থাকবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের তীব্র সংকটসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার দুর্দশা তুলে ধরে তিনি জানান, জনস্বার্থে রাজপথে সক্রিয় লড়াই অব্যাহত থাকবে। বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক, সংস্কারকামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে একযোগে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পরিদর্শনকালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমানসহ এনসিপি, জাতীয় ছাত্রশক্তি, যুবশক্তি ও নারীশক্তির কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

